ফাহিম ফিরোজ : একদিকে হাজারো মানুষের বিচারপ্রাপ্তির ভরসাস্থল, অন্যদিকে মৃত্যুফাঁদে পরিণত হওয়া একটি জরাজীর্ণ ভবন। বরিশাল আদালত প্রাঙ্গণের ঐতিহ্যবাহী ‘লাল বিল্ডিং’ খ্যাত মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ভবন এখন বিচারপ্রার্থী, আইনজীবী ও আদালত সংশ্লিষ্টদের জন্য চরম আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ১৩০ বছরের পুরনো এই ভবনের বিভিন্ন অংশে দেখা দিয়েছে মারাত্মক ঝুঁকি। যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, ব্রিটিশ আমলে নির্মিত এই ভবনের উদ্বোধন হয় ১৮৯৬ সালে। দীর্ঘ এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে ভবনটি বিচারিক কার্যক্রমের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভবনটির দেয়াল, ছাদ ও পলেস্তারা দুর্বল হয়ে পড়েছে। নিয়মিত সংস্কারের অভাব এবং অবহেলায় ভবনটি এখন কার্যত মৃত্যুঝুঁকিতে দাঁড়িয়ে আছে।
শনিবার (২৩ মে) বাকেরগঞ্জ সিভিল জজ আদালতে বিচারিক কার্যক্রম চলাকালে হঠাৎ করেই ছাদের একটি অংশের পলেস্তারা খসে পড়ে। এতে আদালতে উপস্থিত বিচারপ্রার্থী ও আইনজীবীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অল্পের জন্য বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো গেলেও, ঘটনাটি ভবনের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার ভয়াবহ চিত্র সামনে নিয়ে আসে।
রবিবার (২৪ মে) সরেজমিনে দেখা গেছে, ভবনের বিভিন্ন স্থানের ছাদ ও দেয়ালের পলেস্তারা খসে পড়ে রড বেরিয়ে গেছে। কোথাও কোথাও দেয়ালে বড় ফাটল সৃষ্টি হয়েছে। আদালতের করিডোর ও কক্ষজুড়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার চিহ্ন স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। বিচারপ্রার্থী, আইনজীবী ও আদালত কর্মচারীরা আতঙ্ক নিয়ে চলাচল করছেন। অনেকেই মাথার ওপর থেকে পলেস্তারা খসে পড়ার ভয়ে আদালত কক্ষে দীর্ঘ সময় অবস্থান করতেও শঙ্কা প্রকাশ করেন।
এই ভবনে বর্তমানে বরিশাল জন নিরাপত্তা বিঘ্নকারী অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল, বাকেরগঞ্জ সিভিল জজ আদালত ও সেরেস্তা, উজিরপুর সহকারী জজ সিভিল আদালত, বরিশাল মেট্রোপলিটন দ্বিতীয় বিচার আদালত, অতিরিক্ত যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ (সিভিল) আদালতের সেরেস্তা, মেহেন্দিগঞ্জ সহকারী জজ আদালতের সেরেস্তাসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ আদালত ও দপ্তর পরিচালিত হচ্ছে।
এছাড়া নিচতলায় রয়েছে নামাজের স্থান, গৌরনদী সিভিল জজ আদালত ও সেরেস্তা, বরিশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের লাইব্রেরি ও হিসাব শাখা, শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল, অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, নকল শাখা, রেকর্ড রুম ও বরিশাল সাইবার ট্রাইব্যুনাল।
প্রতিদিন এসব আদালতে হাজার হাজার মামলার শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। বিচারপ্রার্থী, আইনজীবী, পুলিশ সদস্য ও আদালত কর্মচারীদের মিলনমেলায় পরিণত হয় পুরো ভবনটি। কিন্তু সেই গুরুত্বপূর্ণ ভবনেই প্রতিনিয়ত জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে সবাইকে।
বাকেরগঞ্জ থেকে আসা বিচারপ্রার্থী শামসুল হক বলেন, “আদালতে আসলে সবসময় ভয় লাগে। মাথার ওপরে কখন কী পড়ে যায় সেই আতঙ্কে থাকতে হয়।” বিচারপ্রার্থী মো. আলামিন বলেন, “এমন ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে বিচারকাজ চলা খুবই উদ্বেগজনক। যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।”
বিচারপ্রার্থী হেলেনা বেগম বলেন, “বিচারের আশায় আদালতে আসি, কিন্তু এখানে এসে নিজের নিরাপত্তা নিয়েই শঙ্কায় থাকতে হয়।”
আইনজীবী মোহাম্মদ শাহে আলম বলেন, “ভবনটি এতটাই ঝুঁকিপূর্ণ যে এটিকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা উচিত। প্রতিদিন আতঙ্ক নিয়ে আদালতে প্রবেশ করতে হয়। কোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটলে তার দায় কে নেবে?”
বরিশাল জেলা আইনজীবী সমিতির সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ ইমন বলেন, “আদালত ভবনের বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। দ্রুত জরুরি ভিত্তিতে নতুন ভবন নির্মাণ না হলে যেকোনো সময় প্রাণহানির ঘটনা ঘটতে পারে।”
বাকেরগঞ্জ আদালতের বেঞ্চ সহকারী রাসেল বলেন, “ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ার ঘটনা নতুন নয়। প্রায়ই ছোটখাটো অংশ খুলে পড়ছে। আতঙ্কের মধ্যেই কাজ করতে হচ্ছে।”
বরিশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের নাজির মো. কামরুল হাসান বলেন, “ভবনটির ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার বিষয়টি একাধিকবার মন্ত্রণালয়কে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্যও অনুরোধ করা হয়েছে।”
সংশ্লিষ্টদের দাবি, ঐতিহ্যবাহী এই আদালত ভবন সংরক্ষণ ও নিরাপদ বিচারিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন।
Daily Bangladesh Bani বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমাদের দৈনিক প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়ে, সমাজের অন্ধকার দিকগুলো উন্মোচন করে প্রতিটি মানুষের সমান অধিকারের প্রচার করি।