বৃহস্পতিবার, জুলাই ৩০, ২০২৬

দুর্দিন যাচ্ছে পিরোজপুরের শাঁখাশিল্পীদের

পিরোজপুর প্রতিনিধি : বাংলাদেশ তথা উপমহাদেশে শাঁখা শিল্পের ইতিহাস ও ঐতিহ্য হাজার বছরের পুরোনো। শঙ্খের তৈরি শাঁখা হিন্দু বিয়ের রীতির প্রধান অনুষঙ্গ। বিবাহিত হিন্দু নারীদের বিশেষ এই অলংকারটি দিন দিন দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠেছে। শাঁখা তৈরির উপকরণ শঙ্খের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধিসহ নানা প্রতিকূলতায় এ শিল্পকে ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন পিরোজপুরের শাঁখাশিল্পীরা। ফলে এ জেলার ঐতিহ্যবাহী শাঁখা শিল্পের সঙ্গে জড়িতদের চরম দুর্দিন চলছে।

উপকরণের মূল্য বৃদ্ধি, ব্যাংক ঋণের সুবিধা না থাকা ও সুষ্ঠু নীতিমালার অভাবে এ শিল্পের অস্তিত্ব এখন হুমকির মুখে। অর্থনৈতিক দৈন্যের কারণে এ শিল্পের সঙ্গে জড়িতদের অনেকেই পেশা ছেড়ে দিচ্ছেন। যারা এর সঙ্গে জড়িত, তারা জানান, দেশ স্বাধীনের পর প্রত্যেক শিল্পী পরিবারে সাহায্য হিসেবে ১০০টি করে প্রায় দেড় লাখ শঙ্খ দেওয়া হয়েছিল। তারা ক্ষোভ ও দুঃখের সঙ্গে জানান, এরপর আর কোনো সরকার এ শিল্পের দিকে নজর দেয়নি। তবুও এ শিল্পের সঙ্গে জড়িতদের অনেকেই নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে জীবন-জীবিকার তাগিদে এখনো এর ঐতিহ্য ধরে রাখতে আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন।

পিরোজপুর শহরের রাজারহাটের শাঁখাশিল্পী জয় নন্দী জানান, বিভিন্ন প্রতিকূলতা, কাঁচামালের মূল্য বৃদ্ধি, ঋণ সুবিধা না পাওয়া, নীতিমালার অভাব, অব্যবস্থাপনা এ শিল্পকে ধ্বংশের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। অর্থনৈতিক দৈন্যতার কারণে তাদের অনেকেই এ পেশা ছেড়ে দিচ্ছেন। তিনি জানান, ১৯৭৩ সালে প্রত্যেক শিল্পী পরিবারে ১০০টি করে প্রায় দেড় লাখ শঙ্খ দেওয়া হয়েছিল। এরপর তাদের সাহায্যে আর কেউ এগিয়ে আসেনি। সরকারের সদিচ্ছার অভাবে এর বাজার ও ভবিষ্যৎ ক্রমেই অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়ছে।

জয় নন্দী জানান, শাঁখা তৈরির উপকরণ বড় আকারের সাদা রঙের শামুক একটি সামুদ্রিক জলজ প্রাণী। শ্রীলঙ্কার এক শ্রেণির মানুষ সমুদ্রের তলদেশ থেকে এ শঙ্খ উত্তোলন করে থাকে। সেখান থেকেই শঙ্খ রপ্তানি হয় ভারত-বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে। এর একটি অংশ ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনাসহ বিভিন্ন স্থানের আমদানিকাররা আমদানি করতেন। পিরোজপুরের শাঁখাশিল্পীরা ঢাকার ঐতিহ্যবাহী শাঁখারিপট্টি, কাজদিয়া, খুলনার ধর্মসভা রোড ও দোলখোলার শঙ্খের মোকাম থেকে শঙ্খ এনে তাদের কারখানায় অলংকার তৈরি করতেন।

তিনি জানান, বাংলাদেশে এখন আর শঙ্খ আমদানি হয় না। ফলে প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে শঙ্খ কিনে এনে শাঁখা বানাতে হয়। এতে তাদের অনেক খরচ পড়ে যায়। ভারত থেকে একটি শঙ্খ কিনতে বর্তমানে চার হাজার থেকে সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা লাগে। একটি শঙ্খ থেকে চার জোড়া শাঁখা তৈরি হয়। প্রতি জোড়া শাঁখা বিক্রি হয়ে থাকে এক হাজার থেকে দেড় হাজার টাকায়। গলার হার সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার টাকা এবং একটি আংটি বিক্রি হয় ১৫০ থেকে ৩০০ টাকায়। তিনি আরো জানান, প্রতি বছর শঙ্খের দাম বাড়তে থাকলেও তাদের তৈরি শঙ্খ অলংকারের প্রকৃত দাম তারা পাচ্ছেন না।

পিরোজপুর শহরের ‘মা শঙ্খ ভান্ডার’-এর মালিক সুমন কুমার দত্ত জানান, এক সময় এই শহরে আটটি শাঁখা কারখানা ও দোকান ছিল। বর্তমানে রয়েছে মাত্র দুটি। শঙ্খের চড়া দাম ও দুষ্প্রাপ্যতার কারণে অনেকেই এ পেশা ছেড়ে দিয়েছেন। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের দেশে শঙ্খশিল্পের অস্তিত্ব আর থাকবে না। প্রয়োজনের তাগিদে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনকে বাধ্য হয়ে ভারত থেকে শাঁখা আনতে হবে। আর এটি নিম্নবিত্তদের জন্য দুষ্প্রাপ্য হবে।

আরো পড়ুন

আমতলীতে গৃহবধূর রহস্যজনক মৃত্যু, পরিবারের দাবি পরিকল্পিত হত্যা

আবু জিহাদ, আমতলী : বরগুনার আমতলী উপজেলার আঠারগাছিয়া ইউনিয়নের ০৪ নং ওয়ার্ড গেরাবুনিয়া গ্রামে মোসা. …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *