বিশ্বাস শিহাব পারভেজ মিঠু, কলাপাড়া
কলাপাড়া উপজেলার ধানখালী ইউনিয়নে স্থাপিত কয়লাভিত্তিক মেগা বিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রভাবে স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রা, কৃষি, পরিবেশ ও আর্থ-সামাজিক অবস্থায় গুরুতর সংকট সৃষ্টি হয়েছে বলে গণগবেষণায় উঠে এসেছে। কৃষিজমি ও উন্মুক্ত জলাশয় হারিয়ে যাওয়ায় বহু মানুষ তাদের চিরাচরিত স্বাধীন পেশা ছেড়ে স্বল্প আয়ের অনিশ্চিত শ্রমজীবী কাজে যুক্ত হতে বাধ্য হয়েছেন।
সোমবার (৩ আগষ্ট) বেলা ১১ টায় কলাপাড়া উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনের ‘পায়রা’ হলে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় ‘আমাদের মাটি, আমাদের জীবন’ শীর্ষক গণগবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়। স্থানীয় জনগণের উদ্যোগে পরিচালিত এ গবেষণার তথ্য নিয়ে প্রকাশিত বুকলেটে ধানখালী ইউনিয়নের পরিবেশগত ও আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
সভায় সভাপতিত্ব করেন কলাপাড়া পরিবেশ ও জনসুরক্ষা মঞ্চের কার্যনির্বাহী সদস্য মেজবাহউদ্দিন মাননু। প্রধান অতিথি ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আরিফুজ্জামান। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা তেন মং, উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা অপু সাহা, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. মোকসেদুল আলম, সমাজসেবা কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মুহাম্মদ আরিফুর রহমান এবং মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা তাছলিমা আখতার। এছাড়া বক্তব্য দেন গণগবেষক মেহেদী হাসান ও হালিমা আয়েশা। গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন একশনএইড বাংলাদেশের অ্যাসোসিয়েট প্রোগ্রাম অফিসার মারজিয়া জাহান। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন প্রান্তজনের মাঠ সমন্বয়কারী সাইফুল্লাহ মাহমুদ।
গবেষণায় বলা হয়, ধানখালীতে কয়েকটি জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক মেগা তাপবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের পর স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রায় নজিরবিহীন পরিবর্তন এসেছে। স্থানীয় উন্নয়ন সংস্থা প্রান্তজনের উদ্যোগে দুই বছর আগে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতায় ২০ জন স্থানীয় বাসিন্দাকে গণগবেষণার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। পরে তারাই স্থানীয় পর্যায়ে এ গবেষণা পরিচালনা করেন। গবেষণাটি বাস্তবায়ন ও প্রকাশ করেছে প্রান্তজন এবং এতে সহায়তা করেছে একশনএইড বাংলাদেশ।
৪৫৭ জন উত্তরদাতার ওপর পরিচালিত জরিপে দেখা যায়, প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে ১৬১ জন কৃষক কৃষিকাজে নিয়োজিত থাকলেও বর্তমানে কৃষি পেশায় টিকে আছেন মাত্র ৫১ জন। অর্থাৎ ১১০ জন কৃষক তাদের প্রধান জীবিকা হারিয়েছেন।
একই সঙ্গে গৃহিণীর সংখ্যা ৯৮ জন থেকে বেড়ে ১৫২ জনে দাঁড়িয়েছে। গবেষকদের মতে, এদের অধিকাংশই আগে কৃষিকাজে যুক্ত ছিলেন। দিনমজুরের সংখ্যা ৪৯ জন থেকে বেড়ে ৭১ জন এবং বেকারের সংখ্যা ৭ জন থেকে বেড়ে ৩২ জনে পৌঁছেছে। ফলে বহু পরিবারের আর্থিক স্বচ্ছলতা কমে গিয়ে সামাজিক সংকট আরও বেড়েছে।
গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়, প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে ৬৭ দশমিক ৮৪ শতাংশ মানুষ নিজেদের আর্থিক অবস্থাকে ভালো বা খুব ভালো বলে উল্লেখ করলেও বর্তমানে মাত্র ১০ দশমিক ০৭ শতাংশ একই মত দিয়েছেন। বিপরীতে ৭১ দশমিক ৩৩ শতাংশ মানুষ বর্তমানে নিজেদের অবস্থা খারাপ বা খুব খারাপ বলে জানিয়েছেন।
এছাড়া সুপেয় পানির সংকট, জলাশয়ের অবক্ষয়, বিশুদ্ধ বায়ুর অভাব, জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি, মাটির লবণাক্ততা বৃদ্ধি, জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি এবং নারীদের ওপর লিঙ্গভিত্তিক প্রভাবসহ বিভিন্ন পরিবেশগত ও সামাজিক সমস্যা বৃদ্ধি পেয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। গবেষকদের দাবি, একসময় ধানখালীর নদী-খালে ইলিশসহ ৩০টির বেশি প্রজাতির মাছ পাওয়া গেলেও এখন তা প্রায় বিলুপ্তির পথে।
২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পরিচালিত এ গণগবেষণায় ধানখালী ইউনিয়নের আটটি ওয়ার্ডের প্রথম পর্যায়ে ৪৫৭টি এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে ৩৯৬টি পরিবারের ওপর জরিপ চালানো হয়। পাশাপাশি উঠান বৈঠক ও মূল তথ্যদাতাদের সাক্ষাৎকারও নেওয়া হয়।
গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, ধানখালীতে বর্তমানে ১,৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার পায়রা (বিসিপিসিএল) ও ১,৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার পটুয়াখালী (আরএনপিএল) বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু রয়েছে। এছাড়া আশুগঞ্জ বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্যও জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। এসব প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণে অন্তত ৬৮৫টি পরিবার সরাসরি বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং পরোক্ষভাবে প্রায় দেড় হাজার কৃষক ও জেলে পরিবার কর্মসংস্থান হারিয়েছে বলে দাবি করা হয়।
গণগবেষণার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন, জীবিকা পুনরুদ্ধার এবং পরিবেশগত ক্ষতি মোকাবিলায় সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন।
Daily Bangladesh Bani বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমাদের দৈনিক প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়ে, সমাজের অন্ধকার দিকগুলো উন্মোচন করে প্রতিটি মানুষের সমান অধিকারের প্রচার করি।