মাহতাব হাওলাদার, মহিপুর প্রতিনিধি: ইলিশের ভরা মৌসুমেও কাঙ্ক্ষিত মাছের দেখা মিলছে না। এর মধ্যে একের পর এক লঘুচাপ, নিম্নচাপ ও বৈরী আবহাওয়ায় উত্তাল থাকছে সাগর। ফলে বারবার সাগরে গিয়ে ফিরে আসতে হচ্ছে জেলেদের। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ভয়াবহ লোডশেডিং। বরফ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় আরও বিপাকে পড়েছেন জেলে, ট্রলার ও মৎস্য ব্যবসায়ীরা। সব মিলিয়ে পটুয়াখালীর কলাপাড়ার মহিপুর-আলীপুর মৎস্যবন্দরে চলছে চরম দুরবস্থা।
মহিপুর ঘাটে গত সাত দিন ধরে নোঙর করে আছে এফবি মা জননী-৯ নামের একটি ফিশিং ট্রলার। ট্রলারের মাঝি আব্দুল করিম বলেন, ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে বৈরী আবহাওয়ার কারণে প্রায় এক মাস বাড়িতে বসে থাকতে হয়েছে। এরপর মহিপুরে এসে ২৭ দিনের মধ্যে একবার সাগরে গিয়ে ৩২ মণ ইলিশ ধরে প্রায় ১৮ লাখ টাকায় বিক্রি করেছেন। এরপর তিন-চারবার সাগরে গেলেও দুবারের বেশি টিকতে পারেননি।
নোয়াখালীর বাসিন্দা আব্দুল করিম ২০০০ সাল থেকে মাঝি হিসেবে সাগরে মাছ শিকার করছেন। তাঁর ভাষ্য, এ পর্যন্ত প্রায় ২৫ লাখ টাকা খরচ হয়ে গেছে। প্রতিবার সাগরে যেতে ৬ থেকে ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। একটি ট্রলারে প্রায় ২৮০ ক্যান বরফ, সাড়ে চার হাজার লিটার জ্বালানি এবং খাবারসহ অন্যান্য সামগ্রী লাগে।
করিম বলেন, গত তিন-চার বছর ধরেই মাছ কমে এসেছে। তবে এ বছর পরিস্থিতি আরও খারাপ। আগে তিন-চার ঘণ্টা বোট চালিয়ে জাল ফেললেই ইলিশ পাওয়া যেত। এখন ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা বোট চালিয়ে ১২০-১৩০ মাইল গভীর সাগরে যাওয়ার পরও কাঙ্ক্ষিত মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। তাঁর ভাষায়, ‘এহন আর মাছ ভাসে না, নিচে থাকে।’
একই দুরবস্থার কথা জানিয়েছেন এফবি রাফায়াত ট্রলারের জেলে তোফাজ্জেল হোসেন। তিনি বলেন, ইলিশের ভরা মৌসুমেও মাছ না পাওয়ায় অনেক ট্রলার সাগরে যেতে পারছে না। তাঁর দাবি, আলীপুর-মহিপুরের খাপড়াভাঙা নদীতে এখন হাজারের বেশি ট্রলার নোঙর করে আছে। কেউ ছেঁড়া জাল মেরামত করছেন, আবার কেউ ঘাটে বসে সময় কাটাচ্ছেন।
শুধু জেলেরাই নন, মাছের আমদানি কমে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন আড়তদার ও শ্রমিকেরাও। মহিপুরের অন্তত ৮০টি মৎস্য আড়তে এখন আগের মতো মাছের নিলাম ও বেচাকেনার হাঁকডাক নেই। লোড-আনলোড শ্রমিকদের অনেকেই কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। মাছ বাছাইয়ের কাজে যুক্ত তিন শতাধিক নারী-পুরুষ শ্রমিকও নিয়মিত কাজ না পেয়ে কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন।
মহিপুর মৎস্য আড়ত মালিক সমিতির সহ-সভাপতি আলহাজ্ব রাজু আহমেদ রাজা বলেন, চলতি মৌসুমের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত একটি আড়তে গড়ে ৩০০ থেকে ৪০০ মণের বেশি ইলিশ আসেনি। তিন-চার বছর আগে একই সময়ে কোনো কোনো আড়তে অন্তত এক হাজার মণ ইলিশের আমদানি হতো।
তিনি বলেন, বৈরী আবহাওয়ার কারণে মাঝারি আকারের ফিশিং ট্রলারের ভাসা জালে এখন ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে না। যে মাছ পাওয়া যাচ্ছে, তা অনেক গভীর পানিতে বড় জাল ফেলে ধরতে হচ্ছে। কিন্তু উত্তাল সাগরে অনেক ট্রলার জাল ফেলার আগেই ফিরে আসতে বাধ্য হচ্ছে।
লোডশেডিংয়ে সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
বরফকল, ট্রলার মালিক ও মৎস্য ব্যবসায়ী এবং মহিপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব মো. ফজলু গাজী বলেন, ‘অবরোধের পর থেকে সবই লস। সাগর উত্তাল থাকায় হাজারো বোট ঘাটে বাঁধা। তিন-চারবার সাগরে গিয়েও কেউ ঠিকমতো থাকতে পারেনি।’
তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় বরফ উৎপাদন করা যাচ্ছে না। টানা ২০-২২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকলে সলিড বরফ উৎপাদন সম্ভব হয় না। তাঁর দাবি, মহিপুর-আলীপুর এলাকায় প্রায় ৩৫টি বরফকল রয়েছে, কিন্তু বিদ্যুৎ সংকটের কারণে সেগুলোর স্বাভাবিক উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
ফজলু গাজীর মতে, অধিকাংশ ট্রলার মালিকেরই তিন-চার লাখ টাকা করে লোকসান হয়েছে। সামনে আশ্বিনে ইলিশের মূল মৌসুম শেষ হয়ে যাবে। ফলে এভাবে বৈরী আবহাওয়া চলতে থাকলে জেলে, ট্রলার মালিক, আড়তদার, বরফকল মালিক ও শ্রমিকসহ এ পেশার সঙ্গে জড়িত হাজারো মানুষ আরও বড় সংকটে পড়বেন।
কলাপাড়া উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা অপু সাহা বলেন, চলতি বছর বৈরী আবহাওয়ার কারণে জেলেদের ইলিশ আহরণে বেশি সমস্যা হচ্ছে। এতে তাঁদের লোকসানও বাড়ছে। তবে সাগর শান্ত হয়ে জেলেরা নিয়মিত জাল ফেলতে পারলে ইলিশের সরবরাহ বাড়বে বলে আশা করছেন তিনি।
Daily Bangladesh Bani বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমাদের দৈনিক প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়ে, সমাজের অন্ধকার দিকগুলো উন্মোচন করে প্রতিটি মানুষের সমান অধিকারের প্রচার করি।