সোমবার, সেপ্টেম্বর ৭, ২০২৬

ভাঙনে অস্তিত্ব সংকটে কুয়াকাটা সৈকত জিও ব্যাগ-টিউবেও মিলছে না স্থায়ী সমাধান, ঝুঁকিতে বনাঞ্চল ও স্থাপনা

মাহতাব হাওলাদার, মহিপুর প্রতিনিধি:
প্রকৃতির রুদ্ররূপ দেখা দিলেই শুরু হয় কুয়াকাটা সৈকতের নতুন করে ভাঙন। বৈরী আবহাওয়া, ঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও বর্ষার প্রবল ঢেউয়ে বছরের পর বছর ক্ষয়ে যাচ্ছে সৈকতের বিস্তীর্ণ এলাকা। একদিকে সংকুচিত হচ্ছে সৈকতের প্রস্থ, অন্যদিকে সমুদ্রগর্ভে বিলীন হচ্ছে বনাঞ্চল, পর্যটন স্থাপনা ও বসতভিটা।
ভাঙন ঠেকাতে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) বিভিন্ন সময়ে জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ও জিও টিউব ফেলছে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব উদ্যোগে সাময়িকভাবে কিছুটা ভাঙন রোধ হলেও স্থায়ী সমাধান মিলছে না। বরং অপরিকল্পিতভাবে জিও ব্যাগ ও টিউব ব্যবহারে অনেক স্থানে সৈকতের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
১৯৯৮ সালে বাংলাদেশ সরকার কুয়াকাটাকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে ঘোষণা করে। সে সময় লেম্বুরবন থেকে গঙ্গামতি পয়েন্ট পর্যন্ত সৈকতের দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ১৮ কিলোমিটার। সময়ের সঙ্গে পশ্চিমে তিন নদীর মোহনা থেকে পূর্বে রামনাবাদ মোহনা পর্যন্ত সৈকতের বিস্তৃতি বেড়ে বর্তমানে প্রায় ২৯ কিলোমিটারে দাঁড়িয়েছে।
তবে দৈর্ঘ্য বাড়লেও কমছে সৈকতের প্রস্থ। প্রতিবছর ঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও সাগরের প্রবল ঢেউয়ে ব্যাপক বালু ক্ষয়ের কারণে ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে কুয়াকাটা সৈকত।
স্থানীয়দের দাবি, গত ৪০ থেকে ৫০ বছরে সমুদ্র প্রায় দেড় থেকে দুই কিলোমিটার ভেতরের দিকে এগিয়ে এসেছে। অব্যাহত ভাঙনে গত এক দশকে বিলীন হয়েছে নারিকেল বাগান, ডিসি পার্কের একাংশ, পূর্বের জাউবাগান, স্থানীয় সরকার বিভাগের গেস্ট হাউস, হোটেল-মোটেলসহ বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। একই সঙ্গে ভিটেমাটি হারিয়েছেন বহু মানুষ।
স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় কুয়াকাটা সৈকতে ছিল বিশাল বিশাল বালুর টেক ও বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল। লোকালয় থেকে সমুদ্র দেখতে যেতে দুই থেকে তিন কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হতো। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই সমুদ্র এখন লোকালয়ের একেবারে কাছে চলে এসেছে।
ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের মৌসুম এলেই সমুদ্র যেন আরও এক ধাপ এগিয়ে আসে লোকালয়ের দিকে। এতে কুয়াকাটার অস্তিত্ব, পরিবেশ ও পর্যটন সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
কুয়াকাটায় ঘুরতে আসা পর্যটক হামিম ও নেয়ামুল বলেন, দূর-দূরান্ত থেকে কুয়াকাটার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে এসে সৈকতের বর্তমান চিত্র দেখে তারা হতাশ হয়েছেন। দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্রটি রক্ষায় দ্রুত কার্যকর ও স্থায়ী উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন তারা।
পরিবেশকর্মী ও সংগঠক আবুল হোসেন রাজু বলেন, প্রতিবছর বর্ষা মৌসুম এলেই পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়। বালু ক্ষয়ের কারণে বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি কোনো কোনো স্থাপনা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, এ বছরও ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল, ট্যুরিস্ট বক্স, মসজিদ, মন্দির, মেরিন ড্রাইভসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন স্থাপনা হুমকির মুখে রয়েছে। এসব রক্ষায় দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
সিকদার রিসোর্ট অ্যান্ড ভিলাসের জিএম আল আমিন হাওলাদার বলেন, আবহাওয়ার বিরূপ প্রভাবে যেভাবে কুয়াকাটা ভাঙছে, এ অবস্থা চলতে থাকলে একসময় পর্যটক ও ব্যবসায়ীরা কুয়াকাটা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন।
তিনি বলেন, কুয়াকাটা দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটনকেন্দ্র। তাই সৈকত রক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে পরিকল্পিত ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নিতে হবে।
গণমাধ্যমকর্মী ও পরিবেশকর্মী মেজবাহ উদ্দিন মাননু বলেন, গত প্রায় ২০ বছর ধরে কুয়াকাটা সৈকতের ১৮ কিলোমিটার এলাকা রক্ষায় একটি স্থায়ী প্রতিরক্ষা প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা শোনা যাচ্ছে। কিন্তু দীর্ঘদিনেও প্রকল্পটির বাস্তবায়ন শুরু হয়নি।
তিনি বলেন, আধুনিক পর্যটন নগরী হিসেবে কুয়াকাটাকে গড়ে তুলতে হলে দ্রুত একটি টেকসই সৈকত রক্ষা প্রকল্প বাস্তবায়নের বিকল্প নেই। ম্যানগ্রোভ ও নন-ম্যানগ্রোভ—উভয় ধরনের বনাঞ্চল এখন ভাঙনের হুমকিতে রয়েছে। ইতোমধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশ বনাঞ্চল বিলীন হয়ে গেছে বলেও দাবি করেন তিনি।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) কলাপাড়ার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শাহ্ আলম বলেন, কুয়াকাটা সৈকতের ১১ দশমিক ৭ কিলোমিটার অংশের দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সুরক্ষার জন্য ২০২৪ সালে ৭৫৯ কোটি টাকার একটি প্রকল্প পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে দাখিল করা হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রকল্পটি বর্তমানে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। আপাতত জরুরি রক্ষণাবেক্ষণের অংশ হিসেবে বিভিন্ন এলাকায় জিও টিউব ব্যবহার করে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা চলছে।
স্থানীয়দের দাবি, জিও ব্যাগ ও জিও টিউব দিয়ে সাময়িকভাবে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা চললেও দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই পর্যটনকেন্দ্র রক্ষায় প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে একসময় কুয়াকাটার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, বনাঞ্চল ও পর্যটন অবকাঠামোর বড় একটি অংশ সমুদ্রগর্ভে হারিয়ে যেতে পারে।

আরো পড়ুন

বরিশাল সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ পরিদর্শনে এ্যাডভোকেট মুয়াযযম হোসাইন হেলাল

নিজেস্ব প্রতিবেদকঃ বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ্যাড. মুয়াযযম …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *