আবু জিহাদ, আমতলী প্রতিনিধি: পায়রা নদীর পাড়। বিকেলের নরম আলো, নদীর মৃদু ঢেউ আর চারপাশের সবুজ প্রকৃতি। এমন মনোরম পরিবেশেও নয় বছরের শিশু রাইদা বিনতে সিদ্দিকের চোখে নেই কোনো আনন্দ। অন্য শিশুরা যখন নদীর পাড়ে ছুটে বেড়ায়, খেলায় মেতে ওঠে, তখন রাইদা নীরবে বসে থাকে ঘাটের পাশে। হাতে বাবার ছবি, পাশে বাবার পরিচয়পত্রের কপি। চোখ যেন বারবার খুঁজে ফেরে পরিচিত সেই মুখ।
তার ছোট্ট মনে একটাই প্রশ্ন—‘বাবা কবে আমার কাছে ফিরবে?’
রাইদার বাবা ইঞ্জিনিয়ার আবু বকর সিদ্দিক (৪৫)। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি গ্রামীণফোনের একটি প্রতিষ্ঠানে ‘রিজিওনাল অপারেশন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স’ (Regional Operation and Maintenance) পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০২০ সালে পটুয়াখালীতে কর্মরত থাকা অবস্থায় তাঁকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয় বলে পরিবারের দাবি।
দীর্ঘ কর্মজীবনের পর তাঁর প্রাপ্য পাওনা ও অন্যান্য অধিকার নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে—এমন অভিযোগও পরিবারের।
এই পাওনা আদায়ের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে পরিবারটি বিভিন্নভাবে দাবি জানিয়ে আসছে। সম্প্রতি সেই দাবির প্রতীক হয়ে সামনে এসেছে ছোট্ট রাইদা।
দেয়ালে সাঁটানো একটি প্রতিবাদী পোস্টারে বাবার ছবি। সেখানে লেখা—বকেয়া পাওনা পরিশোধ ও ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার দাবি। পোস্টারের সামনে গিয়ে বাবার ছবিতে হাত রাখে রাইদা। কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে থাকে। কোনো কথা বলে না। শুধু তাকিয়ে থাকে ছবিটির দিকে।
এই দৃশ্য যেন মুহূর্তেই ভারী করে তোলে চারপাশের পরিবেশ।
বাবার ছবির দিকে তাকিয়ে থাকা শিশুটির চোখে যেন অভিযোগ নেই, আছে শুধু অপেক্ষা।
রাইদার বয়স মাত্র নয় বছর। শ্রম অধিকার কী, চাকরির পাওনা কী, করপোরেট প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক জটিলতা কী—এসব বোঝার বয়স তার হয়নি। সে শুধু জানে, অন্য অনেক শিশুর মতো তারও একজন বাবা আছে। সেই বাবার সঙ্গে কথা বলতে চায়, বাবার সান্নিধ্য পেতে চায়, বাবার হাত ধরে হাঁটতে চায়।
কিন্তু বাস্তবতার কঠিন হিসাব যেন তার সেই সহজ চাওয়ার মাঝেও দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পায়রা পাড়ে অন্য শিশুরা যখন দলবেঁধে খেলাধুলা করে, রাইদা তখন অনেকটা চুপচাপ। কখনো বাবার ছবির দিকে তাকায়, কখনো নদীর পানির দিকে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে। হয়তো তার মনে পড়ে বাবার সঙ্গে কাটানো পুরোনো দিনগুলোর কথা। হয়তো মনে মনে বাবাকে ডাকে।
একজন শিশুর কাছে বাবা শুধু পরিবারের একজন সদস্য নন—বাবা নিরাপত্তা, ভালোবাসা, আশ্রয় ও নির্ভরতার প্রতীক। তাই বাবাকে ঘিরে তৈরি হওয়া দীর্ঘ অনিশ্চয়তা একটি শিশুর মানসিক জগতে কতটা গভীর প্রভাব ফেলতে পারে, রাইদার নীরবতা যেন তারই নির্মম প্রতিচ্ছবি।
পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, বছরের পর বছর একটি প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালনের পর একজন কর্মীর প্রাপ্য পাওনা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু ওই ব্যক্তির ওপর পড়ে না। এর সঙ্গে জড়িয়ে যায় পুরো পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, সন্তানের পড়াশোনা, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং মানসিক স্বস্তি।
শ্রম অধিকার নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিদের মতে, কোনো কর্মীর বেতন, প্রাপ্য সুবিধা কিংবা আইনগত পাওনা নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হলে তা দ্রুত, স্বচ্ছ ও ন্যায়সংগত প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন। দীর্ঘসূত্রতা শুধু একজন কর্মজীবী মানুষকে নয়, তাঁর ওপর নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যদেরও অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দিতে পারে।
রাইদার গল্প তাই শুধু একজন কর্মীর পাওনা আদায়ের দাবি নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একজন বাবার শ্রমের মূল্য, একটি পরিবারের নিরাপত্তা এবং একটি শিশুর স্বাভাবিক শৈশব।
পায়রা নদীর পাড়ে বসে ছোট্ট রাইদা হয়তো এসবের কিছুই বোঝে না। সে বোঝে শুধু বাবার অনুপস্থিতি। বোঝে বাবার ছবির দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করা। বোঝে, বাবার সঙ্গে আবার কথা বলতে চাওয়ার আকুলতা।
তার পরিবারের প্রত্যাশা—আবু বকর সিদ্দিকের কর্মজীবনের প্রাপ্য পাওনা ও আইনগত অধিকার যদি বকেয়া থেকে থাকে, তা যেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত যাচাই করে ন্যায়সংগতভাবে নিষ্পত্তি করে।
কারণ একটি শিশুর কাছে বাবার ফিরে আসার অপেক্ষা কোনো করপোরেট ফাইলের বিষয় নয়, কোনো হিসাবের খাতার সংখ্যাও নয়। সেখানে আছে ভালোবাসা, নিরাপত্তা আর একটি স্বাভাবিক শৈশবের আকাঙ্ক্ষা।
পায়রা নদীর ঢেউ হয়তো প্রতিদিন তীরে এসে ফিরে যায়। কিন্তু রাইদার অপেক্ষা ফিরে যায় না। প্রতিদিন বিকেলে নদীর পাড়ে বসে সে যেন একই প্রশ্ন করে—
‘বাবা, তুমি কবে আমার কাছে ফিরবে?’
এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো রাইদা জানে না। তবে তার নীরব অপেক্ষা বড়দের সামনে একটি মানবিক প্রশ্ন রেখে যায়—একজন মানুষের শ্রমের ন্যায্য মূল্যায়নের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি পরিবারের স্বপ্ন, নিরাপত্তা ও একটি শিশুর শৈশবের মূল্য কি আমরা যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে দেখছি?
Daily Bangladesh Bani বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমাদের দৈনিক প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়ে, সমাজের অন্ধকার দিকগুলো উন্মোচন করে প্রতিটি মানুষের সমান অধিকারের প্রচার করি।