রবিবার, নভেম্বর ৮, ২০২৬

শ্মশান দীপালি: আলোয় আলো আকাশ

কমল সেনগুপ্ত : বরিশাল মহাশ্মশান। সূর্যদেব তখন অস্তাচলে। গোধূলি বিকেল। আকাশজুড়ে রঙের খেলা। কোথাও ছাই কোথাও লালচে-কমলা বর্ণ। বরিশাল মহাশ্মশান তখন লোকে লোকারণ্য। সবাই প্রয়াতদের প্রিয়জন। একে একে প্রতিটি স্মৃতি স্তম্ভে জ্বলে উঠল প্রদীপ আর মোমবাতি। এক, দুই করে হাজার পেরিয়ে লক্ষাধিক। চারদিকে ধূপের ধোয়া।

সমাধিতে সুগন্ধী ফুলের শ্রদ্ধাঞ্জলি। বাতাসে ধুপ আর ফুলের মিষ্টি গন্ধ। কোথাও চোখের জল, কোথাও গীতা পাঠ, আবার কোথাও কীর্তনের করুণ সুর। শোকের সাগরে আলোর বন্যা। এই হচ্ছে বরিশালের হিন্দু সম্প্রদায়ের শ্মশান দীপালি উৎসব। এ উৎসব শ্রদ্ধা-ভালোবাসার, ভক্তি আর স্মরণের। পালিত হল গতকাল ৭ নভেম্বর শনিবার। উৎসবের ইতিহাস প্রায় ১০০ বছরের। মহাশ্মশানের বয়স প্রায় ২০০ বছর।

বরিশাল নগরীর প্রায় প্রাণকেন্দ্রে কাউনিয়া প্রধান সড়ক। সড়ক ধরে পশ্চিম দিকে এগোলেই এই মহাশ্মশানের অবস্থান। শ্মশানটি প্রায় ২০০ বছর আগে ৫ একর ৯৬ শতাংশ জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়। নতুন পুরনো মিলিয়ে মহাশ্মশানে ৭০ হাজারেরও বেশি সমাধি রয়েছে। এরমধ্যে ৬০ হাজারের বেশী পাকা। নানা নকশায়, নানা আকৃতিতে। প্রায় ১০ হাজার কাঁচা মঠ রয়েছে।

এছাড়া প্রায় ৮০০ মঠ রয়েছে যাদের কোন স্বজন নেই। এর মধ্যে প্রায় ১শ বছরের পুরনো মঠও রয়েছে। এদের সবাই দেশান্তরী। সদ্য দেশান্তরী কোলকাতা প্রবাসী অনেকে শ্মশান দীপালি উপলক্ষে বরিশাল আসেন। প্রদীপ জ্বালিয়ে অঞ্জলি দেন বাবা মায়ের সমাধিতে। পরিচয়হীন এ সব সমাধি মঠ এবারে গোলাপী রঙ করা হয়েছে।

যখন শ্মশানে পৌঁছলাম ঘড়ির কাঁটায় বিকেল ৫টা বেজে ১০ মিনিট। ৫টা থেকেই মানুষ আসতে শুরু করেছে। মানুষের চলাচলের সুবিধার্থে কিছু আগ থেকেই যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। মূল সড়কে তিন রাস্তার মুখেই উৎসবের তোড়ণ। ডান হাতে বিসিক সড়ক ধরে হাঁটলেই শ্মশানের প্রবেশ গেট। দেখলাম মানুষ আসছে দলে দলে। সবার হাতেই ব্যাগ। একটু পড়েই আলো জ্বলে উঠলো। কোথাও শ্মশানের নিস্তব্ধতা নেই। ৫ একর ৯৬ শতাংশ ভূমি মানুষের পদচারণায় মুখর। গোধূলি লগ্নে আঁধার তাড়াতে একে একে জ্বলে উঠল মোমবাতি। মোম আর প্রদীপ শিখায় আলোকিত হল মহাশ্মশান।

চারদিক যেন আলোকসাগর। সমাধি থেকে সমাধিতে ছড়িয়ে পড়ে আলো, ধূপের ধোঁয়ায় ঝাপসা হয় আকাশ। মনে হয় এ যেন মৃত্যু নয়, ভক্তির উৎসব। বড় বড় সমাধিতে নানা বর্ণের টুনি লাইট। মনে করিয়ে দিল, আলোয় আলো আকাশ, আকাশ তারায় ভরা। সে এক অবিস্মরণীয় আলোর উৎসব। প্রত্যেক সমাধিতে প্রয়াতর ছবি। ছবির সামনে তার প্রিয় খাবার।

জ্বলছে মোমবাতি আর প্রদীপ, মুঠো মুঠো জ্বলন্ত ধূপকাঠির ঘূর্ণায়মান ধোঁয়া। আহা! কি মোহনীয় পরিবেশ। নিয়ন্ত্রন কক্ষে তখন বাজছিল নজরুলের শ্যামা সংগীত, ‘অন্তরলোক শুদ্ধ হল পবিত্র সেই ধূপ-সুবাসে, ওরে মা-র হাসি মুখ চিত্তে ভাসে চন্দ্রসম নীল আকাশে’। কোথাও চলছে ধর্মগ্রন্থ পাঠ, কোথাও নিচু গলায় কীর্তন, সবাই নীরবে দাঁড়িয়ে স্বজনের সমাধির সামনে। এক কোনে দেখলাম চোখের জল মুছছে এক অকাল বিধবা।

পাশে দাঁড়িয়ে সদ্য শৈশব ছোঁয়া সন্তান, ফ্যাল ফ্যাল দেখছে। বাহির হবার গেটের বাঁ হাতে শ্মশান কালী মন্দির। চলছে পূজার আয়োজন। সমাধিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি শেষে সবাই শ্মশান কালীমাকে প্রণাম করছে। উলুধ্বনির মাঙ্গলিক সুরে মুখরিত মন্দির প্রাঙ্গন। মন ভরে গেল শ্রদ্ধা আর ভক্তিতে। রাত বাড়তে লাগল। মানুষ কমছে না। মহাশ্মশান মানুষ শুন্য হতে প্রায় মধ্যরাত।

শ্মশান দীপালি বরিশালের হিন্দুদের আঞ্চলিক উৎসব। এ আলো মঙ্গলের আলো। এ আলো অন্তরের অন্ধকার দূর করার আলো। কালী পূজার আগের দিন ভূত চতুর্দশী তিথিতে প্রয়াতঃ স্বজনদের সমাধিতে আলো জ্বাললে প্রয়াত আত্মা শান্তি লাভ করে এই বিশ্বাস বরিশালের হিন্দুদের। তবে এখন এ উৎসব বরিশাল ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়েছে পটুয়াখালী, ভোলা, ঝালকাঠি, পিরোজপুরসহ গ্রামে গঞ্জেও।

মহাশ্মশানের শত বছরের পুরনো সমাধি ধ্বসে পড়ছে। এখানে সমাধি রয়েছে রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাসের বাবা সত্যানন্দ দাশ ও পিতামহ সর্বানন্দ দাশ, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অগ্নিপুরুষ বিপ্লবী দেবেন্দ্র নাথ ঘোষ, বিপ্লবী মনোরমা মাসিমা, শিক্ষাবিদ কালিশ চন্দ্র ঘোষ, বিপ্লবী শৈলেশ্বর চক্রবর্তী, বিপ্লবী প্রাণ কুমার সেনসহ বহু গুণিজনের।

বরিশাল নগরীর পশ্চিম কাউনিয়া ও নতুন বাজার এলাকায় ৬ একর জমির উপর এ মহাশ্মশানের জন্ম বরিশাল নগরীর পত্তনের আগেই। ইতিহাস থেকে জানা যায় ধর্ণাঢ্য জমিদারদের আর্থিক সহায়তায় শহরের নতুন বাজারে প্রথম মহাশ্মশান স্থাপিত হয়। পরে তা কাউনিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। ১৯২৭ সাল থেকে উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় শ্মশান দীপালি উৎসব পালিত হয়ে আসছে বরিশাল মহাশ্মশানে।

স্মৃতির দীর্ঘশ্বাস নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বরিশাল মহাশ্মশান। নগরীর কাউনিয়ায় কীর্তনখোলা নদীর কাছাকাছি প্রায় ২০০ বছরের ইতিহাস বুকে ধারণ করে গড়ে ওঠা এই অন্তিম ঠিকানা যেন শুধু মৃতদের অবয়ব নয়, বরং এক জীবন্ত জনপদ। প্রায় ৬ একর (৫ একর ৯৬ শতাংশ) জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত এই মহাশ্মশানে শুয়ে আছেন হাজারো চেনা-অচেনা মানুষ।

নতুন-পুরোনো মিলিয়ে এখানে রয়েছে ৬১ হাজারেরও বেশি সমাধি। এর মধ্যে ৫০ হাজারের অধিক পাকা এবং প্রায় ১০ হাজার কাঁচা মঠ কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিটি মঠ যেন একেকটি পরিবার ও ইতিহাসের পাতা। কিন্তু এই সমাধিক্ষেত্রটির সবচেয়ে বড় বেদনার জায়গা হলো এর শূন্যতা।

স্বজনহীন এমন প্রায় ৮০০টি মঠকে এ বছর আগে হলুদ রঙে রাঙিয়ে দিয়েছে শ্মশান কমিটি। যাদের আপনজন আজ সুদূর প্রবাসে বা অন্য দেশে, সেই অচেনা স্বজনদের মঠগুলোতে নিয়মিত মোমবাতি প্রজ্বলন করে মহাশ্মশান কমিটি। প্রদীপের সেই আলোয় যেন অন্ধকার ঘুচে যায় বেদনাহত আত্মাদের।

আজ এই মহাশ্মশানের প্রবেশপথে বা পাথরে খোদাই করা নামফলকে চোখ রাখলেই চোখে পড়ে বরিশালের বহু গুণী মানুষের শতবর্ষী সমাধি। অশ্বিনী কুমার দত্ত বা ব্রজমোহন দত্তদের উত্তরসূরিদের অনেকেই হয়তো আজ আর দেশে নেই, কিন্তু পাথরে খোদাই করা তাদের সেই পরিচয় আর স্মৃতির ফলক আজও জানান দেয় অতীত গৌরবের কথা।

শহরের কোলাহল থেকে দূরে, এই মহাশ্মশানের প্রতিটি ইটে লেখা আছে বিচ্ছেদের দীর্ঘশ্বাস। বাতাসে যেন ভেসে বেড়ায় হারানো দিনের গান। আপনজনহীন মঠগুলোর গায়ে জ্বলে ওঠা মোমবাতির শিখা প্রমাণ করে, মৃত্যু মানুষকে দূরে ঠেললেও, স্মৃতির আলো কখনো নিভে যায় না। কালের সাক্ষী হয়ে বরিশাল মহাশ্মশান যুগ যুগ ধরে এভাবেই বলে যাবে শেকড়হীন মানুষের ফিরে আসার আকুতি আর ভালোবাসার অমর গাঁথা।

আরো পড়ুন

বরিশাল জেলা জামায়াতের নবনির্বাচিত আমীর ড. মাহফুজুর রহমানের শপথ গ্রহণ

নিজস্ব প্রতিবেদক: ইসলামী আন্দোলনের অগ্রযাত্রায় নেতৃত্বের আনুগত্য অপরিহার্য- অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *