ফাহিম ফিরোজ, বরিশাল : আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বরিশাল জেলার ছয়টি সংসদীয় আসনে নির্বাচনী উত্তাপ এখন তুঙ্গে। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ভোটের মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন প্রার্থীরা। গ্রাম থেকে গ্রাম, পাড়া থেকে মহল্লা—সবখানেই একই দৃশ্য। ভোট চাইছেন, দিচ্ছেন প্রতিশ্রুতি; আবার ভোটারদের কাছ থেকে নিচ্ছেন ভোট দেওয়ার ওয়াদা।
প্রচার–প্রচারণার সময় প্রার্থীরা উন্নয়নের দীর্ঘ তালিকা তুলে ধরছেন ভোটারদের সামনে। নদীভাঙন রোধ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন, যোগাযোগ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, কর্মসংস্থান, মাদক ও সন্ত্রাস দমন, জলাবদ্ধতা নিরসন, খেলাধুলা ও পরিকল্পিত নগর উন্নয়ন—সবই থাকছে প্রতিশ্রুতির ঝুলিতে।
হিজলা উপজেলার ভোটার হাবিউল্লাহ বলেন, “আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা নদীভাঙন। যোগাযোগ ব্যবস্থা খুবই খারাপ। প্রতিবার নির্বাচন এলেই প্রার্থীরা প্রতিশ্রুতি দেন, আমাদের কাছ থেকে ভোট দেওয়ার ওয়াদা নেন। কিন্তু পরে আর তাদের দেখা মেলে না।”
একই সুর বাকেরগঞ্জ উপজেলার ফরিদপুর এলাকার বাসিন্দা সোহেল সন্যামতের কণ্ঠেও। তিনি বলেন, “নদীভাঙন আর যোগাযোগ ব্যবস্থার দুরবস্থা আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় সংকট।”
বরিশাল নগরীর বাসিন্দা গোলাম সারোয়ারের মতে, নগরীর প্রধান সমস্যা মাদক, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি। পাশাপাশি জলাবদ্ধতা নিরসন ও পরিকল্পিত নগর উন্নয়ন এখন সময়ের দাবি। তিনি বলেন, “নির্বাচন এলেই প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি ঝরে। কিন্তু বাস্তবায়ন হয় খুব কমই।”
আসনভিত্তিক প্রচারণার চিত্র:
বরিশাল-৬ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী আবুল হোসেন খান প্রত্যন্ত অঞ্চলে গভীর রাত পর্যন্ত গণসংযোগ চালাচ্ছেন। একইভাবে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মোহাম্মদ মাহমুদুন্নবী ও ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মুফতি ফয়জুল করিম নিয়মিত প্রচারণা ও গণসংযোগে ব্যস্ত সময় পার করছেন।
বরিশাল সদর আসনে ধানের শীষের প্রার্থী অ্যাডভোকেট মো. মজিবর রহমান সরোয়ার সভা-সমাবেশ, উঠান বৈঠক, লিফলেট বিতরণ ও মাইকিংয়ের মাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা চালাচ্ছেন। একই আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েবে আমির, হাতপাখার প্রার্থী মুফতি সৈয়দ মোহাম্মদ ফয়জুল করিম এবং বাসদের প্রার্থী ডা. মনীষা চক্রবর্তীও মাঠে সক্রিয়। ডা. মনীষা চক্রবর্তী জাতীয় সংসদকে ‘কোটিপতিদের ক্লাব’ না বানিয়ে শ্রমজীবী মানুষের কণ্ঠস্বর প্রতিষ্ঠার কথা বলছেন।
বরিশাল-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী রাজীব আহসান হিজলা ও মেহেন্দিগঞ্জের দুর্গম এলাকায় ছুটে বেড়াচ্ছেন। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী অধ্যাপক আব্দুল জব্বার ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের অঙ্গীকার করছেন। ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী সৈয়দ এহসাক মো. আবুল খায়েরও হাতপাখার পক্ষে ভোট চাইছেন।
বরিশাল-৩ আসনে ১০ দলীয় জোটের প্রার্থী ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ ও বিএনপির প্রার্থী অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদিন নির্বাচনী মাঠে সরব। নদীভাঙন রোধ ও মিরগঞ্জ সেতু বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন তারা। জাতীয় পার্টির প্রার্থী গোলাম কিবরিয়া টিপু কারাগারে থাকলেও তার পক্ষে পরিবারের সদস্য ও নেতাকর্মীরা প্রচারণা চালাচ্ছেন।
বরিশাল-২ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী দানবীর সরদার সরফুদ্দিন আহমেদ সান্টু উজিরপুর ও বানারীপাড়ার প্রত্যন্ত এলাকায় গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। পাশাপাশি জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীরাও প্রচারণা অব্যাহত রেখেছেন।
বরিশাল-১ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী এম জহির উদ্দিন স্বপন নিয়মিত সভা-সমাবেশে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। একই আসনে দাঁড়িপাল্লা, হাতপাখা ও বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার আব্দুস সোবাহানও মাঠে সক্রিয়।
ভোটারদের প্রত্যাশা:
নির্বাচনকে ঘিরে প্রতিশ্রুতির এমন বন্যায় ভোটারদের মধ্যে তৈরি হয়েছে আশা ও সংশয়—দুটোই। তাদের ভাষায়, এসব প্রতিশ্রুতি যদি বাস্তবে রূপ নেয়, তাহলে সত্যিই বদলে যেতে পারে জনপদের চিত্র, এগিয়ে যেতে পারে দেশ। এখন দেখার বিষয়, ভোটের পর প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়িত হয়—নাকি সেগুলো থেকেও যায় নির্বাচনী পোস্টারের ভাষায় বন্দি।
Daily Bangladesh Bani বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমাদের দৈনিক প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়ে, সমাজের অন্ধকার দিকগুলো উন্মোচন করে প্রতিটি মানুষের সমান অধিকারের প্রচার করি।