মঙ্গলবার, আগস্ট ১৮, ২০২৬

বর্ষায় ফিরে আসে শৈশবের সেই দিনগুলো

মাহতাব হাওলাদার: আষাঢ়-শ্রাবণের অঝোর ধারায় বদলে যায় প্রকৃতি, আর বৃষ্টির শব্দে জেগে ওঠে হারিয়ে যাওয়া স্মৃতিআকাশজুড়ে কালো মেঘ। হঠাৎ বিদ্যুতের ঝলকানি, তারপরই মেঘের গর্জন। কিছুক্ষণ পর শুরু হয় অঝোর বৃষ্টি। টিনের চালে বৃষ্টির টুপটাপ শব্দ, ভেজা মাটির গন্ধ আর চারপাশের সবুজ প্রকৃতি—সব মিলিয়ে বর্ষা যেন বাংলার প্রকৃতির নিজস্ব এক উৎসব।

আষাঢ়-শ্রাবণের বৃষ্টিতে নদী-নালা, খাল-বিল পানিতে থইথই করে। মাঠ-ঘাট ভরে ওঠে জলে। কোথাও নৌকা ছুটে চলে, কোথাও শিশুরা বৃষ্টিতে ভিজে আনন্দে মেতে ওঠে। বর্ষার পানিতে ধুয়ে-মুছে গাছপালা ফিরে পায় নতুন প্রাণ। কদম, জুঁই, চামেলীর সুবাসে ভরে ওঠে চারপাশ।

তবে বর্ষা শুধু প্রকৃতির রূপবদলের ঋতু নয়; বাঙালির কাছে এটি স্মৃতিরও ঋতু। বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা যেন অতীতের কোনো এক দুপুর, বিকেল কিংবা সন্ধ্যার কথা মনে করিয়ে দেয়।

বৃষ্টিতে ভেজা শৈশব

একসময় বর্ষা মানেই ছিল ছুটির আনন্দ। আকাশ কালো হলেই বই-খাতা এক পাশে রেখে বৃষ্টির পানিতে ছুটে যাওয়া। কখনো খালে, কখনো পুকুরে, আবার কখনো বাড়ির উঠানে জমে থাকা পানিতে চলত হৈ-হুল্লোড়।

জলে-কাদায় গড়াগড়ি, বন্ধুদের সঙ্গে দৌড়ঝাঁপ কিংবা বৃষ্টির মধ্যে ফুটবল—সেসব দিন ছিল নিখাদ আনন্দের। তখন আনন্দের জন্য দামি খেলনা কিংবা প্রযুক্তির কোনো আয়োজন প্রয়োজন হতো না। এক পশলা বৃষ্টিই ছিল উৎসবের উপলক্ষ।

বর্ষার আরেকটি বড় আকর্ষণ ছিল মাছ ধরা। খাল-বিল পানিতে ভরে উঠলে ঝাঁকে ঝাঁকে টেংরা, পুঁটি, শিং, কৈসহ নানা দেশি মাছ ছুটে বেড়াত। শিশুরা দল বেঁধে মাছ ধরতে বের হতো। কখনো বড়শি, কখনো জাল, আবার কখনো ছোট্ট কোনো পাত্রই হয়ে উঠত মাছ ধরার সরঞ্জাম।

সন্ধ্যা নামার পরও কারও বাড়ি ফেরার তাড়া থাকত না। মাছ ধরার আনন্দে সময় কেটে যেত। দিনের শেষে অল্প কয়েকটি মাছ হাতে পেলেও মনে হতো যেন বিশাল কোনো অর্জন হয়েছে।

বদলে গেছে সেই গ্রামবাংলা

সময় বদলেছে। বদলে গেছে মানুষের জীবনযাত্রা। আধুনিকতার ছোঁয়ায় গ্রামবাংলার চিরচেনা অনেক দৃশ্যও আজ হারিয়ে যাচ্ছে।

আগের মতো খাল-বিলের পানিতে দেশি মাছের বিচরণ নেই। অনেক জলাশয় ভরাট হয়ে গেছে। কোথাও পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে, কোথাও দূষণে নষ্ট হয়েছে জলজ পরিবেশ। ফলে টেংরা-পুঁটি, কৈ-শিংয়ের মতো দেশি মাছও আগের মতো সহজে চোখে পড়ে না।

শৈশবের সেই খোলা মাঠও কমে এসেছে। মুঠোফোন, ইন্টারনেট ও প্রযুক্তিনির্ভর জীবনে শিশুদের অবসরও এখন অনেকটাই ঘরকেন্দ্রিক। বৃষ্টির মধ্যে দল বেঁধে মাঠে ছুটে যাওয়ার সেই দৃশ্য তাই অনেকের কাছেই এখন শুধুই স্মৃতি।

তবুও বর্ষা এলে স্মৃতিরা ফিরে আসে।

বৃষ্টি যেন স্মৃতির দরজা খুলে দেয়

বৃষ্টির শব্দের সঙ্গে মানুষের স্মৃতির এক গভীর সম্পর্ক রয়েছে। টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ শুনলেই অনেকের মনে পড়ে যায় ফেলে আসা গ্রামের বাড়ি, উঠান, পুকুরঘাট কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো দুরন্ত দিনগুলো।

কারও মনে পড়ে মায়ের হাতে তৈরি গরম খিচুড়ির কথা, কারও মনে পড়ে বৃষ্টিতে ভিজে বাড়ি ফেরার পর মায়ের বকুনি। কারও মনে পড়ে নৌকায় চড়ে মামাবাড়ি যাওয়ার দিন, আবার কারও মনে পড়ে কাদামাটিতে পা পিছলে পড়ে গিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে হাসাহাসির স্মৃতি।

এই স্মৃতিগুলোর কোনো বাজারমূল্য নেই। কিন্তু জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদগুলোর একটি হয়ে এগুলো মানুষের হৃদয়ে থেকে যায়।

বর্ষা হোক নির্মলতার বার্তা

বর্ষার বৃষ্টি যেমন প্রকৃতির ধুলো-ময়লা ধুয়ে নতুন সবুজের জন্ম দেয়, তেমনি এই ঋতু আমাদের সমাজ ও জীবনেও নির্মলতার বার্তা বয়ে আনতে পারে।

হিংসা, বিদ্বেষ, অন্যায়, অবিচার আর বিভেদের দেয়াল ভেঙে মানুষে মানুষে তৈরি হোক ভালোবাসা ও সম্প্রীতির বন্ধন। সমাজের অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা তৈরি হোক। প্রকৃতির প্রতি দায়িত্বশীল হোক মানুষ।

খাল-বিল, নদী-নালা ও জলাশয় রক্ষা করা শুধু পরিবেশের দায়িত্ব নয়; এটি আমাদের শৈশব, সংস্কৃতি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্মৃতিও রক্ষা করার দায়িত্ব।

কারণ যে খালে একদিন টেংরা-পুঁটি উজিয়ে আসত, যে মাঠে শিশুরা বৃষ্টিতে খেলত, যে পুকুরঘাটে বসে কিশোরেরা গল্প করত—সেসব জায়গা হারিয়ে গেলে শুধু একটি জলাশয় কিংবা একটি মাঠ হারায় না; হারিয়ে যায় একটি প্রজন্মের শৈশবও।

তাই বর্ষা আসুক তার চিরচেনা সৌন্দর্য নিয়ে।
নদী-খাল ভরে উঠুক নির্মল পানিতে, মাঠ ফিরে পাক সবুজের প্রাণ, জলাশয়ে ফিরে আসুক দেশি মাছের বিচরণ। আর মানুষের হৃদয় থেকেও মুছে যাক সব হিংসা ও বিদ্বেষ।

বর্ষার অঝোর ধারায় প্রকৃতি যেমন নতুন জীবন ফিরে পায়, তেমনি আমাদের সমাজেও জেগে উঠুক মানবতা, ভালোবাসা ও সম্প্রীতির নতুন প্রত্যয়।

বর্ষা শুধু একটি ঋতু নয়—এটি বাংলার প্রকৃতি, সংস্কৃতি ও শৈশবের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক আবেগের নাম।

আরো পড়ুন

কুয়াকাটায় ভুয়া ওয়ারিশ সেজে জমি বিক্রি ও দখলের অভিযোগ

মহিপুর প্রতিনিধি: পটুয়াখালীর কুয়াকাটার ফাঁসিপাড়া এলাকায় ভুয়া ওয়ারিশ সেজে জমি বিক্রি ও দখলের অভিযোগ উঠেছে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *