মাহতাব হাওলাদার, মহিপুর প্রতিনিধি: পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলা ভেঙে নতুন উপজেলা গঠনের দাবি দীর্ঘদিনের। সেই দাবির মধ্যে এবার মহিপুরকে প্রশাসনিক উপজেলা হিসেবে গড়ে তোলার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া এবং কুয়াকাটাকে উপজেলা ঘোষণার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের নির্দেশ এসেছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে। ফলে কলাপাড়া উপজেলা ভেঙে নতুন উপজেলা হলে সেটির কেন্দ্র মহিপুর নাকি কুয়াকাটা হবে—এ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
পটুয়াখালী-৪ (কলাপাড়া-রাঙ্গাবালী) আসনের সংসদ সদস্য এবিএম মোশাররফ হোসেনের উদ্যোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে জারি করা পৃথক দুটি পত্র তিনি গত সোমবার (১৭ আগস্ট) নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে প্রকাশ করেন।
তবে নতুন উপজেলা গঠনের বিষয়ে পটুয়াখালী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা পৌঁছেনি বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মাদ শহীদ হোসেন চৌধুরী।
মহিপুরের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার নির্দেশ
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গত ৭ জুনের পত্রে মহিপুর থানাকে প্রশাসনিক উপজেলা হিসেবে ঘোষণার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং এ-সংক্রান্ত কার্যক্রম দ্রুত নিষ্পত্তির নির্দেশ দেওয়া হয়।
অন্যদিকে, গত ১৬ জুলাইয়ের পৃথক পত্রে কুয়াকাটাকে উপজেলা ঘোষণার সম্ভাব্যতা যাচাই করে বাস্তবতার নিরিখে পরবর্তী প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়েছে।
অর্থাৎ, দুটি পত্রেই মহিপুর ও কুয়াকাটার প্রশাসনিক উন্নয়নের বিষয়ে প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। তবে কোনো পত্রেই সরাসরি মহিপুর বা কুয়াকাটাকে উপজেলা হিসেবে ঘোষণা করা হয়নি।
ফলে প্রশাসনিক ও কারিগরি যাচাই-বাছাই শেষে কলাপাড়া উপজেলা থেকে নতুন উপজেলা গঠিত হলে সেটির কেন্দ্র কোন এলাকাকে করা হবে—মহিপুর নাকি কুয়াকাটা—এ প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে।
জেলা প্রশাসকের দপ্তরে আসেনি নির্দেশনা
নতুন উপজেলা প্রতিষ্ঠার বিষয়ে জানতে চাইলে পটুয়াখালীর জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মাদ শহীদ হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী কলাপাড়া উপজেলায় হাজীপুর নামে নতুন একটি ইউনিয়ন হতে যাচ্ছে। এছাড়া মন্ত্রণালয়ের আর কোনো নির্দেশনা-সংবলিত চিঠিপত্র আমার দপ্তরে আসেনি। তবে নতুন উপজেলা প্রসঙ্গে লোকমুখে শুনে আসছি।’
জেলা প্রশাসকের বক্তব্য অনুযায়ী, কলাপাড়ায় নতুন ইউনিয়ন গঠনের প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এগোলেও নতুন উপজেলা প্রতিষ্ঠার বিষয়ে জেলা প্রশাসনের কাছে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা পৌঁছেনি।
কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আরিফুজ্জামান বলেন, ‘ইতোমধ্যে কলাপাড়া উপজেলায় সৃষ্ট নতুন ইউনিয়ন হাজীপুরের সীমানা নির্ধারণের প্রক্রিয়া শেষ করে আগামী দুই-এক দিনের মধ্যে জেলায় পাঠাব। এরপর নতুন ইউনিয়ন হিসেবে সরকার গেজেট প্রকাশ করবে।’
মহিপুরের পক্ষে মৎস্যবন্দর ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব
মহিপুরকে উপজেলা ঘোষণার দাবির পক্ষে স্থানীয়দের যুক্তি, মৎস্যবন্দর, ব্যবসা-বাণিজ্য, জনসংখ্যা, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এলাকাটি প্রশাসনিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মৎস্যবন্দর আলিপুর-মহিপুরকে ঘিরে এ অঞ্চলে ব্যাপক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। ২০১৬ সালে মহিপুর থানা প্রতিষ্ঠার পর এলাকার প্রশাসনিক গুরুত্ব আরও বেড়েছে বলে দাবি করছেন স্থানীয়রা।
তাদের মতে, মহিপুরকে উপজেলা করা হলে উপকূলীয় বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষের প্রশাসনিক সেবা পাওয়ার সুযোগ বাড়বে এবং মৎস্যনির্ভর অর্থনীতির উন্নয়নেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
কুয়াকাটার পক্ষে পর্যটন ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব
অন্যদিকে, কুয়াকাটাকে উপজেলা করার দাবির পক্ষে পর্যটন, অর্থনীতি, যোগাযোগ, অবকাঠামো ও প্রশাসনিক গুরুত্বকে সামনে রাখা হচ্ছে।
দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রসৈকত ও পর্যটনকেন্দ্র কুয়াকাটাকে ঘিরে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে বিপুল বিনিয়োগ হয়েছে। ২০১০ সালে কুয়াকাটা পৌরসভা প্রতিষ্ঠার পর থেকে এলাকাটির নগর ও প্রশাসনিক গুরুত্ব ক্রমেই বেড়েছে। বর্তমানে পৌরসভাটি ‘ক’ শ্রেণির মর্যাদায় উন্নীত হওয়ায় কুয়াকাটার প্রশাসনিক গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
কুয়াকাটাকে উপজেলা ঘোষণার দাবিতে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ গণস্বাক্ষর সংগ্রহসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছেন। একইভাবে মহিপুরের পক্ষ থেকেও উপজেলা বাস্তবায়নের দাবিতে স্থানীয়ভাবে তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।
এমপির উদ্যোগে দুই দাবিই সরকারের কাছে
সংসদ সদস্য এবিএম মোশাররফ হোসেন গত ৫ জুন মহিপুর থানাকে প্রশাসনিক উপজেলা ঘোষণার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ৭ জুন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় মহিপুরের বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়।
অন্যদিকে, কুয়াকাটাকে উপজেলা ঘোষণার বিষয়েও তাঁর পক্ষ থেকে আবেদন করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ জুলাইয়ের পত্রে কুয়াকাটার সম্ভাব্যতা যাচাই করে বাস্তবতার নিরিখে পরবর্তী প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়।
অর্থাৎ, একই সংসদ সদস্যের উদ্যোগে কলাপাড়া থেকে সম্ভাব্য নতুন উপজেলা গঠনের ক্ষেত্রে মহিপুর ও কুয়াকাটা—দুই দাবিই সরকারের বিবেচনায় এসেছে।
কী বলছেন মহিপুর ও কুয়াকাটার নেতারা
মহিপুর থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট শাজাহান পারভেজ বলেন, ‘নতুন ইউনিয়নের গেজেট প্রকাশ হলে আমরা আমাদের দাবি নিয়ে জোরালভাবে অগ্রসর হব। সংসদ সদস্যের ডিও লেটারের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে পত্রের যে নির্দেশনা এসেছে, সে বিষয়ে জেলা প্রশাসক হয়তো একটি প্রতিবেদন দেবেন। সে অনুযায়ী সরকার পদক্ষেপ নেবে।’
কুয়াকাটা পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আলহাজ মতিউর রহমান বলেন, ‘আমরা আশাবাদী, সরকার কুয়াকাটার সামগ্রিক বিষয় বিবেচনায় কুয়াকাটাকেই উপজেলায় উন্নীত করার ঘোষণা দেবে।’
নিকার বৈঠকের দিকেও নজর
এর আগে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস-সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির (নিকার) ১২১তম বৈঠকে দেশের তিনটি নতুন উপজেলা ও একটি নতুন থানা অনুমোদন দেওয়া হলেও মহিপুর বা কুয়াকাটাকে উপজেলা ঘোষণা
Daily Bangladesh Bani বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমাদের দৈনিক প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়ে, সমাজের অন্ধকার দিকগুলো উন্মোচন করে প্রতিটি মানুষের সমান অধিকারের প্রচার করি।