আযাদ আলাউদ্দীন : বরিশাল সদর উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে নজরুল বর্ষ পালনে চরম অবহেলা ও অবজ্ঞার অভিযোগ ইঠেছে। অনুষ্ঠানের ব্যানারে ব্যবহৃত নজরুল বর্ষের বিকৃত লোগো ব্যবহার ও কম সংখ্যক প্রতিযোগীর উপস্থিতি নিয়ে দায়সারা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে।
গত বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) ছিলো সরকার ঘোষিত নজরুল বর্ষের সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার মাদ্রাসা, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্বের উপজেলা পর্যায়ের অনুষ্ঠান। সকাল ১০টায় বরিশাল নগরীর আমতলার মোড় এলাকার এ. আর. এস বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এ প্রতিযোগিতার আয়োজন করে বরিশাল সদর উপজেলা প্রশাসন। আয়োজনের শুরু থেকেই আয়োজক কর্তৃপক্ষের ঢিলেঢালা ভাব পরিলক্ষিত হয় বলে সেখানে উপস্থিত প্রতিযোগিতার কয়েকজন বিচারক অভিযোগ করেন। বিচারকরা সময় মতো উপস্থিত হলেও উপজেলার আয়োজন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা অনুষ্ঠান স্থলে আসেন প্রায় আধাঘণ্টা বিলম্বে।
অনুষ্ঠান স্থানে উপস্থিত প্রতিযোগিতার বিচারক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, জাসাসের নেতৃবৃন্দ ও বিভিন্ন কলেজের প্রতিযোগী সূত্রে জানা যায়, প্রতিযোগিতা শুরুর পূর্বে আলোচনা সভায় সদর উপজেলা ইউএনও ও উপজেলা নজরুল বর্ষ উদযাপন কমিটির সভাপতির অনুপস্থিতিতে প্রধান অতিথির দায়িত্ব পালন করেন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো: আজাহারুল ইসলাম। নজরুল বর্ষ আয়োজনের বিষয় নিয়ে তার বক্তব্য ঘিরে বিকর্ত ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
তিনি বলেন— “কোনো ব্যক্তির নামে বর্ষ ঘোষণা করতে হলে কোনো উপলক্ষ্য যেমন, শতবর্ষ কিংবা সুবর্ণ জয়ন্তী এমন কিছু থাকে। কিন্তু নজরুল বর্ষ কেবলই একজন ব্যক্তির মস্তিষ্ক প্রসূত। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী গত ২৩ মে ময়মনসিংহের ত্রিশালে নজরুল জয়ন্তী পালন করতে গিয়ে উপস্থিত মন্ত্রী, সচিবদের নির্দেশ দেন নজরুল বর্ষ পালনের। তাই এটি কোনো উপলক্ষ্য ছাড়াই শুধু একক সিদ্ধান্তে পালিত হচ্ছে।” অনুষ্ঠানে উপস্থিত অনেকের থেকেই জানা যায়, এ জন্য এসিল্যান্ড আজাহারুল ইসলাম প্রধানমন্ত্রীকে কোনো প্রকার ধন্যবাদ প্রদান করেননি। উপরন্তু মনে হয়েছে তিনি বাধ্য হয়েই এই অনুষ্ঠান করছেন।
আর অবহেলার সবচেয়ে বড়ো প্রমাণ পাওয়া যায়, নজরুল বর্ষ আয়োজনের ব্যানারে ব্যবহৃত লোগো থেকে। এই লোগোটি ছিলো এডিট করা। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে সরবরাহকৃত লোগোটি তারা এডিট করে ‘নজরুল বর্ষ’ স্থলে ‘নজকল বর্য’ ‘ক’-এর নিচে ডট দিয়ে ‘নজরুল’ লিখেছে। যা একান্তই অনুষ্ঠান নিয়ে অবহেলার প্রমাণ বলে মনে করেন, উপস্থিত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিবর্গ।
এ বিষয়ে বরিশাল জেলা (দক্ষিণ) জাসাসের আহ্বায়ক ও নজরুল বর্ষ উদযাপন জেলা কমিটির সদস্য এস এম সাব্বির নেওয়াজ সাগর বলেন, ‘নজরুল বর্ষ’ উপলক্ষ্যে বরিশাল সদর উপজেলা প্রশাসন আয়োজিত শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার উদ্বোধনী ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের জন্য তৈরি ব্যানারে ব্যবহৃত আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের লোগো বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে দেশব্যাপী প্রেরিত লোগোর কপি অনুসরণ না করে জাতীয় কবিকে জাতিগতভাবে ও নতুন প্রজন্মের কাছে অসম্মানিত ও বিকৃতভাবে উপস্থাপনের হীন উদ্দেশ্যে লোগো বিকৃত করা হয়েছে। যা অত্যন্ত আপত্তিকর, অসম্মানজনক ও ক্ষমার অযোগ্য।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কোনভাবেই এই গুরুতর অপরাধের দায় এড়াতে পারেন না। আমাদের জাতীয় কবিকে জাতিগতভাবে ও নতুন প্রজন্মের কাছে হীনউদ্দেশ্যে এভাবে অসম্মানিত ও হেয়প্রতিপন্ন করার অপচেষ্টায় লিপ্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অবিলম্বে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই অনুষ্ঠানটি সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন- উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের একাডেমিক সুপারভাইজার সুচিত্রা বিশ্বাস। তাকে এই বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি জানেন না বলে এড়িয়ে যান। তবে সুচিত্রা বিশ্বাসের বিরুদ্ধে এই অনুষ্ঠানের বিচারক প্যানেল নির্বাচনে যথেচ্ছাচারের অভিযোগ আনেন জাসাস প্রতিনিধি। কমিটির কার্যক্রম বিচারক প্যানেলে যেন কোনোভাবেই পুরোনো ফ্যাসিস্টগোষ্ঠী আসতে না পারে সে জন্য জাসাস উপজেলা নির্বাহী অফিসারের সাথে বসে বিচারক প্যানেল নির্বাচন করলেও সুচিত্রা বিশ্বাস নিজের ইচ্ছা মতো পছন্দের লোকদের বিচারক প্যানেলে নিয়ে আসার চেষ্টা করেন। তাদের মধ্যে কতিপয় চিহ্নিত আওয়ামীপন্থী লোক থাকায় জাসাস প্রতিনিধি তার প্রতিবাদ করেন। পরবর্তীতে তাদের বাদ দিতে বাধ্য হয় উপজেলা প্রশাসন।
নজরুল বর্ষ পালনে বরিশাল সদর উপজেলায় অবস্থিত মাদরাসা ও কলেজসমূহের কর্তৃপক্ষেরও অবহেলা-অনিহা লক্ষ করা গেছে বলেও জানান, জেলা ও মহানগর জাসাস নেতৃবৃন্দ। তাদের মতে কলেজ কর্তৃপক্ষ কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ না করায় নজরুল বর্ষে মাদরাসা ও কলেজ পর্যায়ের এত কমসংখ্যক প্রতিযোগী অংশগ্রহণ করেছে। এ বিষয়ে বরিশাল নগরীর অমৃত লাল দে মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ (ভারপ্রাপ্ত) মোঃ মাহবুবুল হক জানান, তার প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিটি ইভেন্টেই উপজেলা পর্যায়ের প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেছে। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায় থেকে বরিশালের সর্ববৃহৎ বিদ্যাপীঠ সরকারি বিএম কলেজ ও বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কোনো প্রতিযোগী অংশগ্রহণ করেনি বলে জানা যায়।
বরিশাল মেট্রোপলিটন কলেজের অধ্যক্ষ এস.এম আলী নেছার জানান, নজরুল বর্ষের প্রতিযোগিতায় শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ করানোর বিষয়ে তারা কোন চিঠি পাননি।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে বরিশাল সদর উপজেলা একাডেমিক সুপারভাইজার সুচিত্রা বিশ্বাস বলেন, তাদের পক্ষ থেকে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে উপজেলা প্রশাসনের রেজ্যুলেশন ইমেইলের মাধ্যমে পৌঁছে দেয়া হয়েছে।
সার্বিক বিষয়ে বরিশাল সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোছাঃ ফরিদা সুলতানা দৈনিক বাংলাদেশ বাণীকে জানান, বরিশাল সদর উপজেলায় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের দুটি প্রতিযোগিতা অত্যন্ত সুন্দরভাবে সম্পন্ন হয়েছে। ৩০ সেপ্টেম্বর মাদরাসা ও কলেজ পর্যায়ের প্রতিযোগিতা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট কারো অবহেলার প্রমাণ পেলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
Daily Bangladesh Bani বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমাদের দৈনিক প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়ে, সমাজের অন্ধকার দিকগুলো উন্মোচন করে প্রতিটি মানুষের সমান অধিকারের প্রচার করি।