মঙ্গলবার, অক্টোবর ৬, ২০২৬

৩ বছর ধরে ব্যাংকে আটকা জেলা পরিষদের ১০ কোটি ৮৩ লাখ টাকা, থমকে গেছে উন্নয়ন

নিজস্ব প্রতিবেদক : বরিশাল জেলা পরিষদের গচ্ছিত ১০ কোটি ৮৩ লাখ ৫৬ হাজার ৪০৬ টাকা প্রায় তিন বছর ধরে আটকে আছে ন্যাশনাল ব্যাংক পিএলসির বরিশাল শাখায়। বারবার লিখিতভাবে অর্থ ফেরত চাওয়া, নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া এবং শেষ পর্যন্ত আইনি নোটিশ পাঠানোর পরও টাকা ফেরত দেয়নি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। ব্যাংকের পক্ষ থেকে অর্থ ফেরত না দেওয়ার কারণ হিসেবে দেখানো হচ্ছে ‘তারল্য সংকট’।

তবে সরকারি এই অর্থ আটকে থাকায় জেলা পরিষদের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ পরিশোধ, ঠিকাদারদের বিল এবং অন্যান্য আর্থিক কার্যক্রমে জটিলতা তৈরি হয়েছে বলে দাবি জেলা পরিষদ কর্তৃপক্ষের। ফলে গচ্ছিত অর্থ উদ্ধারের অনিশ্চয়তায় থমকে পড়েছে জেলা পরিষদের উন্নয়ন কার্যক্রম। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো-চলতি বছরের ২৯ এপ্রিল ব্যাংককে আইনি নোটিশ দেওয়ার পরও ৬ অক্টোবর পর্যন্ত জেলা পরিষদ একটি টাকাও ফেরত পায়নি।

এমনকি মঙ্গলবার জেলা পরিষদের প্রশাসকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেও ব্যাংক ব্যবস্থাপক নির্দিষ্ট করে বলতে পারেননি, কবে নাগাদ এই বিপুল অর্থ ফেরত দেওয়া সম্ভব হবে। জেলা পরিষদের নথি অনুযায়ী, প্রায় তিন বছর আগে ন্যাশনাল ব্যাংক পিএলসির বরিশাল শাখায় দুটি সঞ্চয়ী হিসাবে বিপুল পরিমাণ অর্থ জমা রাখে বরিশাল জেলা পরিষদ। এর মধ্যে একটি হিসাবে ৬ কোটি ৭ লাখ ৯৬ হাজার ১১ টাকা এবং অপর হিসাবে ৪ কোটি ৭৫ লাখ ৬০ হাজার ৩৯৫ টাকা জমা থাকার কথা উল্লেখ রয়েছে। দুটি হিসাব মিলিয়ে জেলা পরিষদের পাওনা দাঁড়ায় ১০ কোটি ৮৩ লাখ ৫৬ হাজার ৪০৬ টাকা।

জেলা পরিষদের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের বিল পরিশোধের প্রয়োজন হওয়ায় গত বছরের ৪ জুন ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে জমাকৃত সম্পূর্ণ অর্থ প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, জেলা পরিষদ বরিশালের নামে পে-অর্ডারের মাধ্যমে তিন কর্মদিবসের মধ্যে ফেরত দেওয়ার অনুরোধ করা হয়। কিন্তু নির্ধারিত সময় পার হলেও অর্থ ফেরত দেয়নি ব্যাংক। এরপর গত বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর পুনরায় ন্যাশনাল ব্যাংকের বরিশাল শাখায় চিঠি দেয় জেলা পরিষদ। এবার দুটি পে-অর্ডারের মাধ্যমে ১০ কোটি ৮৩ লাখ ৫৬ হাজার ৪০৬ টাকা সর্বোচ্চ পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে পরিশোধের অনুরোধ করা হয়।

জবাবে ন্যাশনাল ব্যাংক বরিশাল শাখার ব্যবস্থাপক মো. আবু মুসা জেলা পরিষদকে জানান, বিষয়টি প্রধান কার্যালয়কে অবহিত করা হয়েছে। তবে প্রধান কার্যালয় থেকে মৌখিকভাবে জানানো হয়েছে, ব্যাংকের তারল্য সংকট এখনো কাটেনি। এ কারণে ওই মুহূর্তে পে-অর্ডার দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ব্যাংকের পক্ষ থেকে আরও আশ্বস্ত করা হয়, সংকট অচিরেই সমাধান হবে এবং তারল্য পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জেলা পরিষদের অর্থ পরিশোধ করা হবে। কিন্তু সেই আশ্বাসের পরও কেটে গেছে দীর্ঘ সময়। এখনো ফেরত আসেনি জেলা পরিষদের কোটি কোটি টাকা। ফলে নিজেদের গচ্ছিত অর্থ ব্যবহার করতে না পারায় উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ ছাড় ও বিল পরিশোধে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।

উন্নয়ন প্রকল্পের টাকা আটকে, বাড়ছে জটিলতা:
জেলা পরিষদের অর্থ আটকে থাকার প্রভাব পড়েছে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডেও। বিভিন্ন প্রকল্পের বিল পরিশোধে অর্থ সংকট তৈরি হওয়ায় ঠিকাদারদের পাওনা পরিশোধ নিয়ে জটিলতা দেখা দিয়েছে বলে দাবি জেলা পরিষদের। জেলা পরিষদের ভাষ্য, গচ্ছিত অর্থ ফেরত পাওয়া গেলে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ পরিশোধসহ স্বাভাবিক আর্থিক কার্যক্রম সচল রাখা সম্ভব হবে। কিন্তু ব্যাংক থেকে অর্থ না পাওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অর্থ ছাড় দেওয়া যাচ্ছে না। ফলে সরকারি অর্থ থাকার পরও তা ব্যবহার করতে না পারায় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে—এমন অভিযোগ উঠেছে।

১ লাখ টাকার চেকও হয়নি পরিশোধ:
শুধু গচ্ছিত অর্থ ফেরত না পাওয়াই নয়, ব্যাংকে টাকা আটকে থাকায় জেলা পরিষদের একটি প্রকল্পের চেকও প্রত্যাখ্যাত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। জেলা পরিষদের একটি প্রকল্পের আওতায় নলশ্রী, দিদিহার, নেছারিয়া হাফেজিয়া মাদ্রাসা ঈদগাহ প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি মো. শহিদুল ইসলামের নামে ১ লাখ টাকার চেক ইস্যু করা হয়। আইনি নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে, ৪৬৪৫৩৭২ নম্বর চেকটি ব্যাংকে উপস্থাপন করা হলেও অর্থ পরিশোধ না করে তা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। জেলা পরিষদের দাবি, এর ফলে শুধু একটি চেকের অর্থ পরিশোধই আটকে যায়নি, বরং সরকারি প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

আইনি নোটিশেও টনক নড়েনি ব্যাংক:
পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে চলতি বছরের ২৯ এপ্রিল ন্যাশনাল ব্যাংক পিএলসি বরিশাল শাখার ব্যবস্থাপক মো. আবু মুসাকে আইনি নোটিশ পাঠান বরিশাল জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য অ্যাডভোকেট আলহাজ্ব মো. আলী আহমেদ। বরিশাল জেলা পরিষদের নিয়োজিত লিগ্যাল অ্যাডভাইজার হিসেবে জেলা পরিষদের প্রশাসকের পক্ষে পাঠানো ওই নোটিশে ১৫ দিনের মধ্যে জেলা পরিষদের গচ্ছিত সমুদয় অর্থ এক বা দুটি পে-অর্ডারের মাধ্যমে পরিশোধের আহ্বান জানানো হয়। অন্যথায় ব্যাংকের বিরুদ্ধে কেন আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে না, সে বিষয়ে কারণ দর্শানোর কথাও বলা হয়। কিন্তু আইনি নোটিশের পরও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি। ৬ অক্টোবর পর্যন্ত জেলা পরিষদ তার গচ্ছিত অর্থ ফেরত পায়নি।

‘কবে টাকা পাব, তার নিশ্চয়তাও নেই’:
মঙ্গলবার বরিশাল জেলা পরিষদের প্রশাসক ও বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক (বরিশাল বিভাগ) আকন কুদ্দুসুর রহমান ন্যাশনাল ব্যাংক পিএলসি বরিশাল শাখার ব্যবস্থাপক মো. আবু মুসাকে জেলা পরিষদে আমন্ত্রণ জানান। এ সময় ব্যাংকে আটকে থাকা বিপুল পরিমাণ অর্থ কবে নাগাদ ফেরত দেওয়া হবে, তা জানতে চান তিনি। তবে ব্যাংক ব্যবস্থাপক নির্দিষ্ট কোনো তারিখ জানাতে পারেননি। এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে জেলা পরিষদের প্রশাসক আকন কুদ্দুসুর রহমান বলেন, জেলা পরিষদের মতো একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের কোটি কোটি টাকা দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংকে আটকে থাকা কোনোভাবেই স্বাভাবিক বিষয় হতে পারে না। তিনি বলেন, বারবার লিখিতভাবে টাকা ফেরত চাওয়া হয়েছে। এমনকি আইনি নোটিশও দেওয়া হয়েছে। এরপরও ব্যাংক কর্তৃপক্ষ নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা দিতে পারছে না। আকন কুদ্দুসুর রহমান বলেন, ‘তারল্য সংকট’ দেখিয়ে দিনের পর দিন সরকারি প্রতিষ্ঠানের অর্থ আটকে রাখা হলে জেলা পরিষদের ঠিকাদারদের বিল এবং উন্নয়ন প্রকল্পের কার্যক্রম মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। এর দায়ভার জেলা পরিষদ বহন করবে কেন-এ প্রশ্নের জবাব ব্যাংক কর্তৃপক্ষকেই দিতে হবে। তিনি আরও বলেন, আজও ব্যাংক ব্যবস্থাপককে সরাসরি জানতে চাওয়া হয়েছে—জেলা পরিষদের টাকা কবে ফেরত দেওয়া হবে। কিন্তু তিনি নির্দিষ্ট কোনো তারিখ বলতে পারেননি।

সরকারি অর্থের নিরাপত্তা ও উন্নয়ন নিয়ে প্রশ্ন:
একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের ১০ কোটি ৮৩ লাখ টাকার মতো বিপুল অর্থ বছরের পর বছর একটি ব্যাংকে আটকে থাকা এবং অর্থ ফেরতের বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা না থাকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ‘তারল্য সংকট’ দেখিয়ে ব্যাংক কতদিন পর্যন্ত একজন সরকারি আমানতকারীর অর্থ আটকে রাখতে পারে, এ নিয়েও সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি অর্থ কোন প্রক্রিয়ায় ব্যাংকে রাখা হয়েছিল, অর্থ আটকে যাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ভূমিকা কী ছিল এবং ব্যাংক কর্তৃপক্ষের অর্থ ফেরত দেওয়ার আইনগত বাধ্যবাধকতা কী-এসব বিষয়ও খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে। জেলা পরিষদের প্রশাসক জানিয়েছেন, জেলা পরিষদের উন্নয়ন কার্যক্রম সচল রাখা এবং গচ্ছিত সরকারি অর্থ উদ্ধারে প্রয়োজন হলে আইনগতসহ সংশ্লিষ্ট সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে-সরকারি প্রতিষ্ঠানের ১০ কোটি ৮৩ লাখ টাকা যদি প্রায় তিন বছর ধরে ‘তারল্য সংকটের’ কারণে ব্যাংকে আটকে থাকে, তাহলে সেই অর্থের নিরাপত্তা কোথায়? আর সরকারি অর্থের ওপর নির্ভরশীল উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর গতি থমকে গেলে এর দায় নেবে কে?

 

আরো পড়ুন

বরিশালে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, ২০ হাজার টাকা জরিমানা

নিজস্ব প্রতিবেদক : বরিশাল নগরীর শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসংলগ্ন বান্দরোড এলাকায় মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *