ফরিদ আহমেদ, নেছারাবাদ প্রতিনিধি :
সবুজ গাছপালার ছায়া, রূপালি নদীর আঁকাবাঁকা পথ আর খালের ওপর ভেসে বেড়ানো শত শত কাঠের নৌকা— দূর থেকে দেখলে মনে হবে কোনো পটুয়া পরম মমতায় ক্যানভাসে এঁকেছেন এক নিখুঁত ছবি। কিন্তু এটি কোনো কাল্পনিক ছবি নয়; এটি জল, জঙ্গল আর বাণিজ্যের অপূর্ব এক মেলবন্ধন, নেছারাবাদ উপজেলা। যা সাধারণ মানুষের কাছে এখনও ‘স্বরূপকাঠি’ হিসেবেই বেশি পরিচিত। রূপালী ইলিশের নদী সন্ধ্যা আর বেলুয়া নদীর কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা পিরোজপুর জেলার এই জনপদটি শুধু একটি ভৌগোলিক অঞ্চল নয়, বরং এটি দক্ষিণাঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্য, ভাসমান অর্থনীতি আর অনন্য গ্রামীণ জীবনযাত্রার এক জীবন্ত ক্যানভাস।
১. ভাসমান পেয়ারা বাজার : জলের বুকে সবুজের মেলা
স্বরূপকাঠির কথা উঠলেই সবার আগে চোখে ভাসে এখানকার ঐতিহ্যবাহী ভাসমান পেয়ারা ও আমড়ার বাজার। বিশেষ করে আষাঢ়, শ্রাবণ ও ভাদ্র মাসে কুড়িয়ানা, আটঘর ও ভীমরুলী (ঝালকাঠি সীমানা ঘেঁষা) এলাকার খালগুলো পরিণত হয় এক সবুজ উৎসবে।এখানকার খালের ওপর নৌকায় নৌকায় চলে পেয়ারা বেচাকেনা। চাষিরা বাগান থেকে তাজা পেয়ারা পেড়ে সরাসরি নৌকায় করে নিয়ে আসেন বাজারে। এই দৃশ্য দেখতে প্রতি বছর হাজার হাজার পর্যটক ভিড় জমান।
এছাড়া পেয়ারার মৌসুম শেষ হতেই শুরু হয় সুস্বাদু আমড়ার মৌসুম। এখানকার বড় বড় আমড়া দেশজুড়ে সমাদৃত।
২. ভাসমান কাঠের আড়ত : খালের বুকে কাঠের রাজ্য
নেছারাবাদ (স্বরূপকাঠি) উপজেলায় অবস্থিত ভাসমান কাঠের হাট দেশের একটি অনন্য এবং ঐতিহ্যবাহী বাণিজ্য কেন্দ্র। সন্ধ্যা নদীর বিভিন্ন শাখা খাল ও মোহনায় গড়ে ওঠা এই হাটটি কাঠ ব্যবসার জন্য দেশজুড়ে বিখ্যাত। লোহাকাঠ, মেহগনি, রেইনট্রি ও চাম্বলসহ হরেক রকম কাঠের বিশাল সমাহার রয়েছে এখানে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ ঘরবাড়ি নির্মাণ বা আসবাবপত্র তৈরির জন্য এখান থেকে কাঠ সংগ্রহ করেন।
৩. ভাসমান নৌকার হাট : জলের ওপর জীবনের মেলা
নদীমাতৃক এই অঞ্চলে যাতায়াতের অন্যতম প্রধান মাধ্যম নৌকা। আর এই নৌকার চাহিদাকে কেন্দ্র করে স্বরূপকাঠির আটঘর-কুড়িয়ানা এবং জিন্দাকাঠির মতো এলাকায় গড়ে উঠেছে বিশাল নৌকা তৈরির হাট। এখানকার মিস্ত্রিরা বংশপরম্পরায় নিখুঁত দক্ষতায় তৈরি করেন ডিঙি নৌকা, ট্রলার ও কোষা নৌকা। সম্পূর্ণ দেশীয় কাঠ দিয়ে তৈরি এসব নৌকা সাশ্রয়ী মূল্যে কিনতে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসেন স্বরূপকাঠিতে।
৪. নার্সারি শিল্প: সবুজের রাজধানী
স্বরূপকাঠির আরেকটি বড় পরিচয় এটি বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ নার্সারি অঞ্চল। উপজেলার আকলম, অলংকারকাঠি, সংগীতকাঠি, কুড়িয়ানাসহ বিভিন্ন গ্রামে মাইলের পর মাইল জুড়ে গড়ে উঠেছে কয়েক হাজার নার্সারি। এখানে ফলদ, বনজ, ঔষধি এবং দেশি-বিদেশি নান্দনিক ফুলের চারা উৎপাদন করা হয়।
দেশের মোট চাহিদার একটা বড় অংশ জোগান দেয় স্বরূপকাঠির এই সবুজ বিপ্লবীরা। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের পাইকাররা প্রতিদিন এখান থেকে চারা কিনে নিয়ে যান। এই নার্সারি শিল্প হাজারো বেকার পুরুষ ও নারীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
৫. মৃৎশিল্প : মাটির ছোঁয়ায় প্রানের স্পন্দন
ফুল, ফলে ঘেরা নার্সারি পর স্বরূপকাঠির গোনমান গ্রামের মৃৎশিল্পের পরিচিতি খুব পুরনো। কাঁচা মাটি দিয়ে তৈরি ব্যাংক, ফুলদানি, খেলনাসহ হরেক রকম মাটির তৈরি জিনিস পাওয়া যায় এখানে। মাটির তৈরি এসব জিনিসও ছড়িয়ে যায় সারা দেশে।
৬. শীতলপাটি: মায়াবী বুনন শিল্প
স্বরূপকাঠির ঐতিহ্যবাহী কুটির শিল্পের মধ্যে শীতলপাটি অন্যতম। এখানকার বিশেষ এক শ্রেণির বেত (মুর্তা বেত) দিয়ে গ্রামীণ নারীরা পরম যত্নে বুনে চলেন এই পাটি। গরমের দিনে শরীরকে শীতল রাখার এই প্রাকৃতিক চাদরটির কদর যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। যদিও আধুনিক প্লাস্টিক পণ্যের ভিড়ে এই শিল্পটি এখন অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই করছে।
৭. প্রাচীন পুরাকীর্তি ও ঐতিহাসিক নিদর্শন :
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি স্বরূপকাঠির বুকে লুকিয়ে আছে প্রাচীন ইতিহাস ও স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন।
মিয়া বাড়ি মসজিদ (শহিদ মিনার সংলগ্ন): মোঘল বা সুলতানি আমলের স্থাপত্যরীতির ছোঁয়া মেলার এই প্রাচীন মসজিদটিতে। এর দেয়ালের সুনিপুণ গাঁথুনি এবং কারুকার্য পর্যটকদের মুগ্ধ করে।
জমিদার বাড়ির অবশিষ্টাংশ: এই অঞ্চলের বিভিন্ন গ্রামে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে প্রাচীন জমিদারদের কাচারি বাড়ি, সানবাঁধানো ঘাট ও পুরোনো মঠ, যা কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
ছারছিনা দরবার শরিফ: ১৯০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই দরবার শরিফ ও দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি নেছারাবাদের নামকরণের (মরহুম পীর সহেব নেছারউদ্দীন আহমদের নামানুসারে) সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
অলংকারকাঠী সরকারবাড়ি পঞ্চরত্ন মঠ: সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রাচীন স্থাপত্যশৈলীর এক চমৎকার নিদর্শন এই মঠ ও মন্দির এলাকা।
শহিদ স্মৃতি এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস: ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে স্বরূপকাঠির রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল ও ত্যাগের ইতিহাস। স্বরূপকাঠি পাইলট স্কুল ও সন্ধ্যা নদীর তীরবর্তী অঞ্চলগুলো মুক্তিযুদ্ধের বহু স্মৃতি বিজড়িত।
ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সংকটঃ
সম্ভাবনাময় এই জনপদটি কিন্তু নানামুখী সংকটের মুখোমুখি। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, নদী ভরাট হয়ে যাওয়া এবং সন্ধ্যা নদীর নব্যতা সংকটের কারণে বড় বড় কাঠের কার্গো চলাচলে সমস্যা হচ্ছে। এছাড়া, আধুনিক প্রযুক্তির অভাব এবং সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণের সুবিধা না থাকায় অনেক ক্ষুদ্র ফার্নিচার ব্যবসায়ী ও নার্সারি মালিকেরা তাদের ব্যবসা বড় করতে পারছেন না। পর্যটনের বিশাল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও আবাসন ও উন্নত যাতায়াত ব্যবস্থার অভাবে পর্যটকেরা এখানে এসে নানা ভোগান্তিতে পড়েন।
নেছারাবাদ (স্বরূপকাঠি) কেবলই একটি উপজেলা নয়, এটি মানুষের কঠোর পরিশ্রম আর প্রকৃতির আশীর্বাদের এক অপূর্ব সমন্বয়। ভাসমান হাট, কাঠের গন্ধ আর সবুজের এই সমারোহকে যদি সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয়ভাবে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া যায়, তবে এই অঞ্চলটি দেশের অর্থনীতি ও পর্যটন শিল্পে আরও বড় অবদান রাখতে সক্ষম হবে।
Daily Bangladesh Bani বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমাদের দৈনিক প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়ে, সমাজের অন্ধকার দিকগুলো উন্মোচন করে প্রতিটি মানুষের সমান অধিকারের প্রচার করি।