মাহতাব হাওলাদার, মহিপুর প্রতিনিধি:
পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার নীলগঞ্জ ইউনিয়নের পাখিমারার খালের ওপর একটি স্থায়ী সেতুর অভাবে বছরের পর বছর দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন কুমিরমারা, নেয়ামতপুর ও এলেমপুর গ্রামের শত শত সবজিচাষি। কৃষকের উৎপাদিত সবজি ও অন্যান্য কৃষিপণ্য পাখিমারার পাইকারি বাজারে নিতে বর্তমানে তাঁদের একমাত্র ভরসা নিজেদের অর্থায়নে নির্মিত ড্রামের ওপর কাঠের পাটাতন বসানো একটি ভাসমান সেতু।
স্থানীয় কৃষকেরা জানান, প্রতিবছর এসব গ্রাম থেকে অন্তত ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকার সবজি ও অন্যান্য কৃষিপণ্য উৎপাদিত হয়। কলাপাড়া উপজেলার বড় একটি অংশের সবজির চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি উদ্বৃত্ত সবজি প্রতিদিন বাস, ট্রাক ও পিকআপে দেশের বিভিন্ন এলাকার আড়তে পাঠানো হয়। অথচ উৎপাদন ও সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই যোগাযোগব্যবস্থা এখনো স্থায়ী হয়নি।
স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রায় ৩০ বছর ধরে তাঁরা পাখিমারার খালের ওপর একটি সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছেন। বর্ষাকালে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। ভেতরের মাটির রাস্তাগুলো কাদায় পরিণত হলে কৃষকদের উৎপাদিত সবজি বাজারে নিতে নানা ভোগান্তিতে পড়তে হয়। দূরের কৃষকদের অনেক সময় নৌকায় খাল পার হয়ে বাজারে যেতে হয়।
কুমিরমারার কৃষক আব্দুল আজিজ হাওলাদার বলেন, পাখিমারার খালটি প্রায় ৩০০ ফুট প্রশস্ত। এই খাল পারাপারের জন্য কৃষকেরা নিজেদের অর্থায়নে ড্রামের ওপর কাঠের পাটাতন বসিয়ে ভাসমান সেতু তৈরি করেছেন। বিভিন্ন সময় নিজেদের উদ্যোগে এবং বিভিন্ন জিও-এনজিওর সহায়তায় সেটি মেরামত করা হলেও দীর্ঘদিন ধরে সচল রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
কুমিরমারার প্রবীণ কৃষক সুলতান গাজী বলেন, তিনি ৪০ থেকে ৪৫ বছর ধরে সবজি চাষ করছেন। তাঁর ভাষ্য, কুমিরমারাসহ আশপাশের তিন গ্রামের অন্তত সাড়ে পাঁচ শ কৃষক প্রতিবছর ২০ থেকে ২৫ কোটি টাকার সবজি ও কৃষিপণ্য উৎপাদন করেন। এসব পণ্য পাখিমারার আড়তে নিতে তাঁদের এই খাল পার হতে হয়। বর্ষায় দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়।
স্থানীয়দের দাবি, ২০১৬ সালে চাকামইয়া এলাকার আরপাঙ্গাশিয়া নদীর ওপর ভেঙে পড়া একটি লোহার সেতুর কিছু মালামাল এনে পাখিমারার খালের ওপর একটি সেতু নির্মাণ করা হয়েছিল। তবে দুই বছরের মধ্যেই সেটি নষ্ট হয়ে যায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, ওই সময় সেতুটির ভালো খুঁটি ও স্লিপারসহ কিছু মালামাল সরিয়ে অপেক্ষাকৃত অকেজো সামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছিল। তাঁদের অভিযোগ, উপজেলা পরিষদের উদ্যোগে সেতুটি নির্মাণ করা হয়েছিল। তবে অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সেতুটি নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর কৃষকদের উদ্যোগে তৈরি ভাসমান ড্রাম সেতুই হয়ে ওঠে তাঁদের একমাত্র ভরসা। বছরের পর বছর এভাবেই পারাপার করতে হচ্ছে কৃষক, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থীসহ স্থানীয় বাসিন্দাদের।
কৃষকেরা বলছেন, তাঁরা প্রতিবছর কোটি কোটি টাকার কৃষিপণ্য উৎপাদন করে স্থানীয় অর্থনীতিতে অবদান রাখছেন। অথচ তাঁদের উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করার জন্য কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণের উদ্যোগ দীর্ঘদিনেও বাস্তবায়িত হয়নি। দ্রুত পাখিমারার খালের ওপর একটি স্থায়ী গার্ডার সেতু নির্মাণের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
নীলগঞ্জ ইউনিয়নের প্রশাসক ও উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো. নাহিদ হাসান বলেন, পাখিমারার খালের ওপর একটি গার্ডার সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) এটি বাস্তবায়ন করবে। নীলগঞ্জের সবজিচাষিদের সুবিধার কথা বিবেচনা করেই সেতুটি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এলজিইডির উপজেলা প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামান বলেন, কুমিরমারাসহ আশপাশের গ্রামের কৃষকদের কৃষিপণ্য পরিবহন ও যোগাযোগব্যবস্থা সহজ করতে পাখিমারার খালের ওপর ৪৯০ মিটার দীর্ঘ একটি গার্ডার সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর নকশা প্রক্রিয়া প্রায় শেষ পর্যায়ে। নেভিগেশন ছাড়পত্রও নেওয়া হয়েছে। এখন জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অনুমোদনের পর দ্রুততম সময়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ থেকে মুক্তি পেতে এখন কৃষকদের অপেক্ষা স্থায়ী সেতুর। তাঁদের প্রত্যাশা, পরিকল্পনা ও আশ্বাসের গণ্ডি পেরিয়ে দ্রুত বাস্তবে রূপ নেবে পাখিমারার খালের ওপর সেই কাঙ্ক্ষিত সেতু।
Daily Bangladesh Bani বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমাদের দৈনিক প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়ে, সমাজের অন্ধকার দিকগুলো উন্মোচন করে প্রতিটি মানুষের সমান অধিকারের প্রচার করি।