বৃহস্পতিবার, জানুয়ারি ২৯, ২০২৬

বরগুনা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে খেজুরের গুড়ের ঐতিহ্য

মইনুল আবেদীন খান সুমন, বরগুনা
এক সময় শীত এলেই বরগুনা জেলা যেন খেজুরের গুড়ের সুবাসে মাতোয়ারা হয়ে উঠত। ভোরের কুয়াশা ভেদ করে গাছের মাথায় ঝুলে থাকা হাঁড়িতে জমত সাদা খেজুরের রস, আর সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলত সেই রস জ্বাল দিয়ে গুড় তৈরির কর্মযজ্ঞ। ২০ থেকে ২৫ বছর আগেও এমন দৃশ্য ছিল প্রায় প্রতিটি গ্রামে। প্রতিটি পরিবারই ছিল নিজের গাছের রস থেকে তৈরি গুড়ের মালিক। কিন্তু সময়ের বিবর্তনে আজ বরগুনা থেকে সেই খেজুরের গুড়ের ঐতিহ্য প্রায় বিলুপ্তির পথে।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, বরগুনা জেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ও গ্রামাঞ্চলে খেজুর গাছ এখন চোখে পড়ে খুবই কম। স্থানীয়দের দাবি, যেখানে একসময় শত শত খেজুর গাছ দেখা যেত, সেখানে এখন এক শতাংশ গাছও টিকে নেই। বেশিরভাগ গাছ হয় মরে গেছে, নয়তো ইটভাটার মালিকদের কাছে বিক্রি হয়ে গেছে জ্বালানি কাঠ হিসেবে। দিনের পর দিন নির্বিচারে গাছ কেটে ইটভাটার চুল্লিতে পোড়ানো হয়েছে, যার ফলেই আজ এই সংকট।
বরগুনা সদর উপজেলার বড় লবণ গোলা গ্রামের এক প্রবীণ রস সংগ্রাহক মোসলেম আলী হাওলাদার বলেন, এক সময় শীতকালে আমাদের ঘুম হতো রাত তিনটায়। রস তুলতে গাছে উঠতাম। সকাল হলেই হাঁড়ি ভরে রস নামানো হতো। সেই রস জ্বাল দিয়ে গুড় বানিয়ে হাটে বিক্রি করতাম। এখন গাছই নেই, আমরা পেশাও হারিয়ে ফেলেছি।
এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও এই সংকটকে আরও তীব্র করেছে। আগের মতো শীত আর নেই, শীতের স্থায়িত্ব কমে গেছে। ফলে রসের পরিমাণ কমে গেছে, গাছও দুর্বল হয়ে পড়ছে। অনেক গাছ রোগাক্রান্ত হয়ে দ্রুত মারা যাচ্ছে। অন্যদিকে ইটভাটার দাপটে কৃষিজমি ও গাছপালা উজাড় হয়ে যাওয়াও অন্যতম বড় কারণ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, খেজুর গাছের কোনো সরকারি সংরক্ষণ নীতি নেই। গাছ কেটে ফেললেও বাধা দেওয়ার কেউ নেই। ইটভাটার মালিকরা মোটা অঙ্কের টাকায় গাছ কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। অভাবের তাড়নায় মানুষ বাধ্য হয়ে গাছ বিক্রি করছে, কিন্তু এর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির কথা কেউ ভাবছে না।
একসময় বরগুনার খেজুরের গুড় ছিল জেলার গর্ব। আশপাশের জেলা এমনকি দূর-দূরান্ত থেকেও মানুষ এই গুড় কিনতে আসত। শীত মৌসুমে গুড়ের তৈরি নানা পিঠা-পুলি ছিল ঘরে ঘরে উৎসবের অংশ। আজ সেই ঐতিহ্য শুধু স্মৃতিতেই সীমাবদ্ধ।
খেজুর গাছ শুধু গুড়ের উৎস ছিল না, এটি উপকূলীয় এলাকায় প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে এই গাছ অনেকাংশে প্রাকৃতিক বাঁধের মতো কাজ করত। এখন গাছ কমে যাওয়ায় দুর্যোগের ঝুঁকিও বেড়েছে বলে মনে করছেন পরিবেশবিদরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই যদি উদ্যোগ না নেওয়া হয়, তাহলে বরগুনায় খেজুর গাছ ও খেজুরের গুড় সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে যাবে। সরকারি উদ্যোগে ব্যাপকভাবে খেজুর গাছের চারা রোপণ, গাছ কাটায় নিয়ন্ত্রণ এবং ঐতিহ্যবাহী গুড় উৎপাদনকে উৎসাহিত করা জরুরি। পাশাপাশি ইটভাটাগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান পরিচালনার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।
বরগুনাবাসীর ধারণা, যে গুড় একসময় ছিল তাঁদের ঐতিহ্য, জীবিকা ও সংস্কৃতির অংশ, তা কি শুধু ইতিহাসের পাতাতেই হারিয়ে যাবে। ইতিবাচক কোন উদ্যোগ গ্রহণ করা না হলে আর ফিরবে না খেজুর রসের মিষ্টি সুবাসে ভরা সেই দিনগুলো প্রত্যাবর্তন আর সম্ভব হবে না সেই দিনের।

আরো পড়ুন

ফিসনেট প্রকল্প এর সহযোগিতায় তালতলী বহুঅংশীজনীয় মৎস্যজীবী নেটওয়ার্ক এর দ্বি-মাসিক সভা অনুষ্ঠিত হয়

তালতলী প্রতিনিধি।। অদ্য ২১.০১.২০২৬ তারিখ বুধবার তালতলী ফিসনেট প্রকল্প এর অফিস কক্ষে সেন্টার ফর ন্যাচারাল …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *