শনিবার, অক্টোবর ১০, ২০২৬

গুণী শিক্ষক নির্বাচন এর ভাইভার স্মৃতি

খান বাশার।।

২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মাননীয় ডিজি মহোদয়ের সামনে জাতীয় পর্যায়ের ‘শ্রেষ্ঠ গুণী শিক্ষক নির্বাচন’-এর ভাইভার জন্য বরিশাল বিভাগের প্রতিনিধিত্ব করতে আমরা ৩ জনসহ সারা দেশের মোট ২৪ জন উপস্থিত হই।

​যেহেতু আমি অতি নগণ্য মানুষ হয়েও এরকম একটা গুণীজনের মিলনমেলায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছি, তাই কৌতুহলী মন সকলের মাঝের গুণগুলো খুঁজতে লাগলো। সবাই বেশ আত্মবিশ্বাসী, দৃঢ়চেতা, বিজ্ঞানমনস্ক, তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ, সৃজনশীল ও সাবলীল। একদিকে নিজেকে খুব ভাগ্যবান ও গর্বিত মনে হচ্ছিল, অন্যদিকে আমার অসুস্থ দুই মেয়েকে বরিশালের বাসায় রেখে ঢাকায় প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়াটায় অপরাধবোধ কাজ করছিল। সব মিলিয়ে আনন্দ, অস্বস্তি ও উৎকণ্ঠা নিয়েই সময় পার করছি।

​জীবনের এই মহামূল্যবান সময়টায় যেভাবে সবার সাথে আলাপচারিতার মাধ্যমে কিছু শেখার ও জানার সুযোগ ছিল, তা আর সাবলীলভাবে হয়ে ওঠেনি। তারপরেও ভাইভার জন্য ওয়েটিং রুমের আড্ডায় দু-একটা কথা চলছিল। আমার একপাশে রংপুরের দিবা ম্যাম, আর পাশে লতিফা নিলুফার পাপড়ি ম্যাম। তাঁর পাশেই বসে আছেন সাদা লম্বা চুল ও দাড়িওয়ালা, বেশ শান্ত ও কোমল, কিন্তু চোখ-মুখে প্রচণ্ড প্রফুল্লচিত্তের একজন মানুষ। বুঝতে পারছিলাম, তিনি কারো সহযোগিতায় সফল সঙ্গী হয়ে এসেছেন।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, “আপনার পরিচয়?” তিনি পাপড়ি ম্যামকে দেখিয়ে বললেন, “ওঁর সাথে এসেছি।” কথা বলার ধরন ও হাঁটাচলা দেখে মনে হলো তিনি সাধারণ কেউ নন। আমি আবারও জিজ্ঞেস করলাম, “আপনি কী করেন?” বললেন, “আগে সাংবাদিকতা করতাম, এখন লেখালেখি করি, ছড়া লিখি।” এই বলে কিছু বই আমাকে দিলেন।

​আমার স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য—বই পড়ি আর না পড়ি, বই দেখলে কেনা চাই-ই চাই। মেয়েদের জন্য বই চাইলে তিনি আরো কিছু বই দিলেন। ভাবলাম, স্মৃতিটা ধরে রাখি। যেহেতু পাপড়ি ম্যামের সাথে উনি এসেছেন, তাই আমাদের দুলাভাই হিসেবে গা-ঘেঁষা একটা ছবি হতেই পারে। ছবিটাও সেভাবেই তুললাম।

​আরো অনেক গুণীজনের সাথে সংক্ষিপ্ত কথা হলো। রকমারি সাজগোজের ম্যামদের বাহারি উপস্থাপনা, নতুন নতুন উপকরণের আইডিয়া আর ছবি তোলার উৎসব—সবই উপভোগ করেছি। চোখ এদিক-ওদিক করে গুণীজনদের গুণগুলো খোঁজার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু আমার চোখ তো অতি সাধারণ! যা দিয়ে কেবল বাহ্যিক সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধতা ছড়ানো যায়, আসল গুণ দেখা যায় না; গুণ অবলোকন করতে হয়, অনুভব করতে হয়।

​তা টের পেলাম বাড়িতে আসার পর। বড় মেয়ে ও ছোট মেয়েকে বইগুলো দেওয়ার দুই-তিন দিন পর বড় মেয়েকে জিজ্ঞেস করলাম, “বইয়ের লেখা কেমন লাগে, বল তো?” আমার বড় মেয়ে স্পষ্টভাষী, সব সময় সোজাসাপ্টা কথা বলে। সে বললো, “খুব ভালো, বাবা! ছড়াগুলো খুব ভালো লাগছে।”

​এবার আমার কৌতুহল আরও বেড়ে গেল। রাতে ‘মনুস্বর’ বইখানা হাতে নিলাম, দুই-চারটি লেখা পড়লাম। পাপড়ি ম্যামের লেখাটা পড়ার পর নড়েচড়ে বসলাম। এতো অসাধারণ ব্যক্তিত্বের একজন মানুষ আমার পাশে বসেছিলেন! কেন আমি তাঁর সাথে আরও কিছু কথা বললাম না? কেন তাঁকে আর একটু জানতে পারলাম না?

​বইটিতে দেশের যেসকল বরেণ্য লেখক, কবি, সাংবাদিক ও সাহিত্যিক তাঁর সম্পর্কে লিখেছেন, তা দেখে আমার লেখার দুঃসাহস কেটে গেছে। আমার সে যোগ্যতা নেই যে, লিখে তাঁকে ভাষায় প্রকাশ করবো। এতোক্ষণে তাঁর নামটাই বলা হয়নি—তিনি হলেন বাংলা সাহিত্যের বিরাট বটবৃক্ষ, জীবন্ত কিংবদন্তি ছড়াকার, লেখক, সফল সাংবাদিক, সমাজসেবক, রাজনৈতিক সচেতন মানুষ, সেরা সংগঠক এবং সফল একজন বাবা (যতটুকু তাঁর ছেলের লেখায় পেয়েছি) ও সফল স্বামী (তাঁর স্ত্রীর লেখায় পাওয়া অনুভূতির আলোকে)। এক কথায়, তিনি এক সফল, মানবিক লেখক ও মহান মানুষ।

এখনো তাঁকে নিয়ে পড়ে যাচ্ছি। এই যে লেখাটির মূল কারণ—এ দেশে গুণীজনের কদর নেই! অথচ প্রচারবিমুখ এই গুণী মানুষটি আমার এই সাধারণ চোখকেও এড়িয়ে যেতে পারেননি। তাঁর কত কত লেখা, কবিতা, ছড়া, বই, কলাম ও সম্পাদকীয় রয়ে গেছে—এগুলো কি এ দেশের দায়িত্বশীল সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, বাংলা একাডেমি এবং যাঁরা শিল্প-সাহিত্যের ধারক-বাহক, তাঁদের নজরে পড়ে না?

এমনও তো শুনি, অন্যের লেখা নিজের বলে চালিয়ে দিয়ে পদক ও ডিগ্রি পাওয়া যায়! আমি তো মনে করি, বিশিষ্ট সাংবাদিক ও ছড়াকার জনাব আবদুল হামিদ মাহবুব সাহেবকে রাষ্ট্রীয়ভাবে মূল্যায়ন করার এখনো উপযুক্ত সময় রয়েছে। বইমেলায় কিংবা একুশে পদকে তাঁকে ভূষিত করা হোক, না হয় তাঁর লেখাগুলো রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রচারণা করা হোক—তাতে সমাজ ও নাগরিক বহুমাত্রিক বিচারে উপকৃত হবেন।

​আর আমি আবদুল হামিদ মাহবুব ভাইয়ের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি—আপনার সাথে গা-ঘেঁষে ছবি তোলার মতো যোগ্যতা আমার ছিল না। আবার যদি কখনো দেখা হয়, পা ছুঁয়ে কদমবুসি করে নেবো। আল্লাহ আপনাকে আরো সম্মানিত করুন। রাষ্ট্রীয় আমন্ত্রণে আপনি সম্মানিত হোন। রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারকেরা আপনাকে চিনুক ও সঠিক মূল্যায়ন করুক।
​পরিবার-পরিজন ও সমাজ নিয়ে আপনি নিরাপদ ও সুস্থ থাকুন। আপনার মতো সৃজনশীল ও মানবিক মানুষগুলো ভালো থাকুক। আমার ও আমার পরিবারের জন্য দোয়া করবেন—আমার সন্তানরা যেন প্রকৃত মানবিক মানুষ হতে পারে। আল্লাহ হাফেজ।

লেখকঃ
শ্রেষ্ঠ গুণী শিক্ষক বরিশাল বিভাগ ২০২৬

আরো পড়ুন

আরিফুর রহমানের পিতার ইন্তেকাল, দৈনিক বাংলাদেশ বাণীর পরিবারের শোক

নিজস্ব প্রতিবেদক : দৈনিক বাংলাদেশ বাণী পত্রিকার কম্পিউটার অপারেটর আরিফুর রহমানের পিতা মো. সেকান্দার আলী …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *